বিশ্ব

স্টারলিংকের বিকল্প ইউক্রেনের হাতে নেই, আর ইউরোপের উত্তর আসবে ২০২৯ সালে

এক ব্যক্তির মালিকানার এক প্রতিষ্ঠান এমন এক সামর্থ্য জোগায়, যার ওপর ইউক্রেন নির্ভর করে কিন্তু যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। বিকল্পগুলো ধীর, ভারী আর পাঁচ গুণ দামি—আর ইউরোপের বিকল্পটি তিন বছর দূরে।

স্টারলিংকের বিকল্প ইউক্রেনের হাতে নেই, আর ইউরোপের উত্তর আসবে ২০২৯ সালে

গত সপ্তাহে ইউক্রেনের আকাশে স্টারলিংক-এর গতি কমে যায়। সেবা মাত্র সম্প্রতি ফিরেছে, আর এই সময়ের মধ্যে রুশ হামলার বিরুদ্ধে কিয়েভের আত্মরক্ষার সামর্থ্য পরিমাপযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞাটি কে অনুমোদন করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পেন্টাগন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্কের মধ্যে দায় চাপানোর একটি অমীমাংসিত পর্ব চলছে। তবে ঘটনাটি তর্কের ঊর্ধ্বে যা প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা হলো নির্ভরতার আকৃতি।

স্টারলিংক কেন, অন্য কিছু নয় কেন

স্টারলিংক এবং এর সামরিক মানের সেবা স্টারশিল্ড—দুটিরই মালিক মাস্কের স্পেসএক্স। ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগে স্টারলিংক আর ড্রোনযুদ্ধসহ সামরিক কাজে স্টারশিল্ড ব্যবহার করে, কারণ দুটিই দেয় দ্রুত ও তাৎক্ষণিক সংযোগ।

‘এ ধরনের উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া ড্রোনযুদ্ধ চালানো যায় না,’ বলেন ফরাসি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের গবেষক ভিনসেন্ট তুরে।

নাম না প্রকাশ করে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা সৈনিকেরা আরও সরাসরি। একজন বলেন, ‘ঈশ্বর না করুন, তারা যদি একেবারে বন্ধ করে দেয়, তা হবে চূড়ান্ত বিপর্যয়।’ ‘জীবন যখন বাজি, তখন বিকল্পের দাম কত তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।’

আরেকজন ব্যাখ্যা করেন ব্যবধানটি: স্টারলিংক ‘নির্দেশ পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে রাখে—এক-দুই সেকেন্ডও গুরুত্বপূর্ণ যখন আমরা তথ্য ও আদেশ দ্রুত পাঠাতে পারি, আর যুদ্ধক্ষেত্রে সেই সুবিধা সত্যিই টের পাওয়া যায়।’

৬০০ · ১০,০০০ · ২০২৯
ইউটেলস্যাটের সক্রিয় উপগ্রহ, স্টারলিংকের নক্ষত্রপুঞ্জ, আর ইউরোপের নিজের আইরিস-টু চালু হওয়ার নির্ধারিত বছর। গ্রাফিক: টেক বিডি।

বিকল্পগুলোর হিসাব

ওয়ানওয়েব সেবা নিয়ে ফ্রান্সের ইউটেলস্যাটই প্রধান বিকল্প। তাদের সক্রিয় উপগ্রহ প্রায় ৬০০। স্টারলিংকের ১০ হাজারের বেশি—বিশ্বের বৃহত্তম নক্ষত্রপুঞ্জ।

উপগ্রহের মতোই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল। স্টারলিংকের টার্মিনাল এতটাই ছোট ও হালকা যে তা যেকোনো যানে, এমনকি ড্রোনেও বসানো যায়। সাবেক প্রধান নির্বাহী এভা বেরনেকে বলেন, ইউটেলস্যাটের টার্মিনাল ‘কিছুটা বড়, ফলে গাড়ির ছাদে বা ট্যাংকে বসানো যায়, কিন্তু ছোট ড্রোনে তা সব সময় বসানো যায় না।’ আর এগুলোর দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজের নেটওয়ার্ক আইরিস-টু বানাচ্ছে। সেটি চালু হবে না ২০২৯ সালের আগে।

ইউরোপ এ বছর কী দিতে পারে

এ মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে আছে গভস্যাটকম—জানুয়ারিতে গড়া একটি নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে সদস্যদেশগুলো বিদ্যমান উপগ্রহ ভাগ করে নেয়। ইউক্রেন পূর্ণ সদস্য নয়, হতে চেষ্টা করছে; ইউরোপীয় কমিশন কিয়েভের সঙ্গে আলোচনায় আছে।

কিন্তু ইউক্রেন কালই যুক্ত হলেও গভস্যাটকম ড্রোন চালানোর মতো যুদ্ধ-কাজে ব্যবহার করা যায় না—অথচ স্টারশিল্ড ঠিক সেই কাজেই ব্যবহৃত হয়। আগামী বছরের শুরুতে এটি বদলাতে পারে, যখন কমিশন আশা করছে ওয়ানওয়েবসহ বাণিজ্যিক পরিচালকেরা কার্যক্রমে যোগ দেবে। ইউক্রেনের যোগদানের কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি, আর যখন হবে তখনো তা বিকল্প নয়, সম্ভবত বিকল্প-সহায় হিসেবেই থাকবে।

বেরনেকে বিবিসিকে বলেছেন, তিনি আশাবাদী যে ইউটেলস্যাট ‘ইউক্রেনের মূল সামরিক চাহিদার বড় একটি অংশে সহায়তা করতে’ পারবে—শর্তটি লক্ষ করুন। ইউটেলস্যাট নিজে গভস্যাটকম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, কেবল বলেছে ‘পূর্ণ সক্রিয় লো আর্থ অরবিট নক্ষত্রপুঞ্জের একমাত্র ইউরোপীয় পরিচালক হিসেবে আমরা সহনশীল সংযোগ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।

নিচের রাজনৈতিক সমস্যাটি

ফরাসি এমইপি ক্রিস্তফ গ্রুদলের লিখেছেন, ‘ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ট্রাম্প বা মাস্কের খেয়ালের ওপর নির্ভর করতে পারে না।’

সিএসআইএসের অ্যারোস্পেস সিকিউরিটি প্রজেক্টের পরিচালক কারি বিনজেন বিষয়টির নাম দিয়েছেন নিখুঁতভাবে: ‘সেই নির্ভরতার উল্টো পিঠ’ উন্মোচিত হয়ে গেছে। ‘এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সামর্থ্য, যার ওপর ইউক্রেন নির্ভর করে কিন্তু যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই।’

ধৈর্য ধরার পক্ষে মাস্ক নিজে কোনো সহায়তা করেননি। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছর বলেছিলেন, স্পেসএক্স নির্ভরযোগ্য না হলে তিনি অন্য সরবরাহকারী খুঁজবেন। উত্তরে মাস্ক লিখেছিলেন, ‘চুপ করো, ছোট মানুষ... স্টারলিংকের কোনো বিকল্প নেই।’

ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, ইউরোপ বুঝে গেছে তার নিরাপত্তা মহাকাশের ওপর নির্ভরশীল, আর তাকে ‘জরুরি ভিত্তিতে উপগ্রহ সামর্থ্য বাড়াতে’ হবে।

বাকিদের জন্য প্রশ্নটি

২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশে স্টারলিংক লাইসেন্স পেয়ে চলছে, আর দেশের যে অংশে ফাইবারের বাস্তব কোনো পথ নেই, সেখানে এটি বিলাসিতা নয়—সত্যিকারের উত্তর। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা সে কথাকে মিথ্যা করে না। এটি অন্য একটি কথা বলে, যা একক বিদেশি মালিকানার নেটওয়ার্কে জরুরি ট্রাফিক তুলে দেওয়া যেকোনো দেশ বা ব্যবসার জন্যই সত্য: আপনি যে সেবার মান পাচ্ছেন, তা অন্য কোথাও নেওয়া একটি বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—আর সেটি কী, তা আপনি জানবেন ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তার না বদলানো আপনার সবচেয়ে বেশি দরকার।

কাজের উত্তরটি বর্জন নয়। কাজের উত্তরটি হলো—আগেই জেনে রাখা, ব্যর্থ হলে আপনি কোথায় ফিরবেন।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।