আইফোনের ভেতরের কন্টাক্টলেস প্রযুক্তিতে অ্যাপল প্রবেশাধিকার বাড়ালে যুক্তরাজ্যের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা নতুন পেমেন্ট, টিকিট ও ভ্রমণ অ্যাপ পেতে পারেন বলে জানিয়েছে দেশটির কম্পিটিশন অ্যান্ড মার্কেটস অথরিটি (সিএমএ)। সংস্থাটি চায়, এ প্রবেশাধিকারের জন্য অ্যাপল যে ফি নেয় তা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কম’ হোক।
নিয়ন্ত্রক আসলে কী চাইছে
সিএমএ এমন ব্যবস্থার বিষয়ে পরামর্শ চাইছে, যাতে হোস্ট কার্ড এমুলেশন (এইচসিই) ব্যবহার করা অ্যাপগুলোকে প্রবেশাধিকার দিতে অ্যাপল বাধ্য হয়। এটি বহুল ব্যবহৃত একটি বিকল্প কন্টাক্টলেস মান, যা যুক্তরাজ্যে অ্যাপল এখনো অনুমোদন করে না। এইচসিই থাকলে কোনো অ্যাপ ফোন নির্মাতার নিজস্ব পেমেন্ট স্তরের ভেতর দিয়ে না গিয়ে নিজেই কন্টাক্টলেস লেনদেন সামলাতে পারে।
নিয়ন্ত্রকের যুক্তি, অ্যাপলের বর্তমান ফি ও শর্ত আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবন ও বেড়ে ওঠা আটকে রাখছে। যুক্তরাজ্যে এখন প্রতি পাঁচটি লেনদেনের প্রায় দুটি কন্টাক্টলেস, আর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করেন—যার মধ্যে অ্যাপলেরটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়।

অ্যাপলের জবাব
বিবিসিকে অ্যাপল বলেছে, বর্তমান ব্যবস্থাতেই যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের ডেভেলপাররা নিজেদের অ্যাপের ভেতরেই কন্টাক্টলেস লেনদেনের সুবিধা দিতে পারছেন—দোকানে পরিশোধ, ট্রানজিট পাস, গাড়ির চাবি কিংবা অনুষ্ঠানের টিকিট, সবই। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এতে ‘ডেভেলপার ও ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের জন্য উদ্ভাবনী পণ্য ও সেবা বানাতে পারে… আর ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তামানে সুরক্ষিত থাকে’।
তাদের আপত্তি স্পষ্ট: ‘আমরা মনে করি না, কম গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার কোনো পথ নিতে সিএমএর অ্যাপলকে বাধ্য করা উচিত।’ গত বছর প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করেছিল ইইউর পথ অনুসরণ না করতে, যারা একাধিক প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য খুলে দিতে বাধ্য করেছে। সিএমএর জবাব, ইইউর মতো নয়—তারা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের আন্তঃকার্যকারিতায় মনোযোগ দিচ্ছে, যেমন ডিজিটাল ওয়ালেট ও ঘড়ি।
যুক্তির পেছনের সংখ্যাগুলো
সিএমএ একে শিল্পনীতির প্রশ্ন হিসেবেই দেখাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ফিনটেক খাতের লেনদেন ২১৪ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি, আর এতে যুক্ত ৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান; নিয়ন্ত্রক বলছে অ্যাপলের শর্ত এই বৃদ্ধিকে আটকে রাখছে। তারা ইইউর উদাহরণ টানছে, যেখানে প্রযুক্তি খুলে দেওয়ার পর নতুন ব্যবসা তৈরি হয়েছে, আর বলছে এখানে কী কী আসতে পারে: অ্যাকাউন্ট-টু-অ্যাকাউন্ট পেমেন্ট, ডিজিটাল পরিচয়, ভ্রমণ পাস ও ডিজিটাল চাবি।
ঢাকা থেকে এটি নজরে রাখার কারণ
বাংলাদেশের পেমেন্ট বাজার প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সেবার ওপর—বিকাশ, নগদ ও অন্যরা—আর ট্যাপ-টু-পের বদলে কিউআর কোডের ওপর। সাধারণত এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় কার্ড ব্যবহারের হার দিয়ে, কিন্তু নীরব আরেকটি কারণও আছে: আইফোনে স্থানীয় কোনো ওয়ালেট কখনোই কন্টাক্টলেস চিপটি সরাসরি ব্যবহার করতে পারেনি। নিজের অ্যাপে ট্যাপ-টু-পে বানাতে চাইলেও কোনো দেশি এমএফএস প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না, তাদের প্রকৌশলীদের সামর্থ্য যা-ই হোক।
অর্থাৎ লন্ডনে যা নিয়ে তর্ক চলছে, সেটিই এ দেশের বাজারকে কিউআরে আটকে রেখেছে। বড় বাজারগুলোতে এইচসিইর প্রবেশাধিকার স্বাভাবিক হয়ে গেলে বিকাশ বা নগদের ট্যাপ-টু-পে সুবিধার কারিগরি বাধাটি আর থাকে না; বাকি থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম আর টার্মিনালের খরচ—যেগুলো নিয়ে দেশি প্রতিষ্ঠান সত্যিই কাজ করতে পারে।
দ্বিতীয় শিক্ষাটি অস্বস্তিকর। ব্রিটেনের ফিনটেক খাত ২১৪ বিলিয়ন পাউন্ডের, নিয়ন্ত্রকের হাতে আইনি ক্ষমতা আছে—তবু তারা এখনো কেবল পরামর্শ চাইছে। বাংলাদেশের আকারের বাজারে এ ধরনের দরকষাকষির ক্ষমতাই নেই। ছোট বাজার পায় সেটুকুই, বড় নিয়ন্ত্রকেরা যা আদায় করেন—তাই সিএমএ ও ইউরোপীয় কমিশনের দিকে নজর রাখা দরকার, কারণ তাঁদের ফলাফল একসময় এখানেও পৌঁছায়, এখানকার কারও কিছু না চাইতেই।
কী হতে পারে, কী হবে না
একটি বাস্তবতা মনে রাখা দরকার: সিএমএর সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যে প্রযোজ্য, বাংলাদেশে নয়। অ্যাপল সাধারণত নিয়ন্ত্রকের চাপে যে পরিবর্তন আনে, তা ওই দেশ বা অঞ্চলের জন্যই সীমিত রাখে—ইইউর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। অর্থাৎ লন্ডনে এইচসিই খুলে গেলেও ঢাকার ব্যবহারকারী আপনাআপনি তা পাবেন না।
তবু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে। এক, কারিগরি পথটি একবার তৈরি হয়ে গেলে পরে অন্য বাজারে চালু করা অনেক সহজ—বাধা তখন প্রকৌশল নয়, সিদ্ধান্ত। দুই, বড় নিয়ন্ত্রকদের আদায় করা ছাড় ক্রমে শিল্পমান হয়ে ওঠে, আর ছোট বাজার সেটুকুই পায়। নিজেদের নিয়ন্ত্রকের হাতে একই ক্ষমতা না থাকলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।




