বিশ্ব প্রযুক্তি

বেসামরিক সরকারি ব্যবস্থা থেকে ডিপসিক সরানোর নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের — সঙ্গে এর মডেলে বানানো সবকিছুও

নিষেধাজ্ঞা অ্যাপের চেয়ে অনেক দূর যায়—মডেল ব্যবহার করে বানানো প্রযুক্তিতেও। উন্মুক্ত উৎসের একটি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সীমারেখাটি টানা অনেক কঠিন।

বেসামরিক সরকারি ব্যবস্থা থেকে ডিপসিক সরানোর নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের — সঙ্গে এর মডেলে বানানো সবকিছুও

চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিকের সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বেশির ভাগ সরকারি ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বেসামরিক সংস্থাগুলোতে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে—আর নিষিদ্ধ করেছে এর এআই মডেলের সহায়তায় বানানো যেকোনো প্রযুক্তিও।

পরিধি, আর তারিখ

নির্দেশটি প্রযোজ্য বেসামরিক সংস্থাগুলোর জন্য, যার মধ্যে আছে ট্রেজারি, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও বিচার বিভাগ। প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধীন সংস্থাগুলো এর বাইরে। ডিএইচএস নির্দেশটি প্রকাশ্যে এনেছে সোমবার, তবে তা কার্যকর হয়েছে জুলাইয়ের শেষ থেকে—অর্থাৎ সরকারের বাইরে কাউকে জানানোর প্রায় তিন মাস আগে থেকেই এটি চালু ছিল।

নোটিশে নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের বিস্তারিত বলা হয়নি। ডিএইচএস, ডিপসিক ও ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

প্রথম মডেলে ৬০ লাখ ডলার
ডিপসিকের জানানো খরচ, যা মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ের তুলনায় সামান্য—এ কারণেই উন্মুক্ত মডেল এত দ্রুত ছড়িয়েছে। গ্রাফিক: টেক বিডি।

দ্বিতীয় শর্তটিই কঠিন

একটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করা সহজ। ‘এর এআই মডেলের সহায়তায় বানানো যেকোনো প্রযুক্তি’ নিষিদ্ধ করা সহজ নয়, কারণ ডিপসিক উন্মুক্ত উৎসের—বিনা মূল্যে পাওয়া যায়, চালানোও সস্তা—আর মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোই তা নিজেদের বিক্রি করা পণ্যে জুড়ে নিয়েছে। স্নোফ্লেক, ভার্সেল ও ওপেনরাউটার—সবাই গ্রাহকদের দেওয়া সেবায় ডিপসিক ব্যবহার করে। স্টার্টআপগুলো সাধারণভাবেই উন্মুক্ত মডেলের দিকে ঝুঁকেছে।

ফলে কোনো সরকারি ক্রয় কর্মকর্তাকে এখন কেবল সরবরাহকারীর পণ্যটি কী তা নয়, সেটি কোন মডেল দিয়ে প্রশিক্ষিত বা নির্মিত তা-ও নিশ্চিত করতে হবে—এমন প্রশ্ন বেশির ভাগ চুক্তিতে কখনো করা হয়নি, আর বেশির ভাগ সরবরাহকারী এর পরিষ্কার উত্তরও দিতে পারবেন না। এ নির্দেশের সবচেয়ে বেশি কাজ বাড়ানো অংশটি সম্ভবত এটিই।

যে খরচের হিসাব ডিপসিককে গুরুত্বপূর্ণ করেছে

একজন ডেভেলপারের জন্য গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রপিকের ক্লদ কিংবা ওপেনএআইয়ের কোডেক্সের মতো বদ্ধ মডেলের তুলনায় ডিপসিক ব্যবহারের খরচ ভগ্নাংশমাত্র। আর নিজেদের মডেল বানাতে ডিপসিকের খরচ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় বিপুল পরিমাণে কম: প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, প্রথম সংস্করণটি প্রশিক্ষণে লেগেছিল প্রায় ৬০ লাখ ডলার।

এ সংখ্যাটির কারণেই নিষেধাজ্ঞাটি যতটা নিরাপত্তার, ততটাই বাণিজ্যেরও গল্প। ২০২৫ সালে প্রকাশের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বেড়েছে, চাহিদা এতটাই যে মাঝেমধ্যে তাদের সার্ভার বসে গেছে; আর অ্যাপলের তালিকায় তাদের বিনা মূল্যের চ্যাটবট অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি নামানো অ্যাপগুলোর একটি।

রাজনৈতিক কাঠামোটিও স্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের প্রযুক্তিপ্রধান মাইকেল ক্র্যাটসিওস এ বছর এক অভ্যন্তরীণ নোটে লিখেছেন, মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহার’ ঘটছে, মূলত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পথে থাকা অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই—দুই প্রতিষ্ঠানই দাবি করেছে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মডেল কার্যত নকল করেছে, যাদের মধ্যে ডিপসিকও আছে।

ঢাকার ডেভেলপারের জন্য এর মানে

আইনি দিক থেকে কিছুই নয়। নির্দেশটি মার্কিন বেসামরিক সংস্থাগুলোর জন্য, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; উন্মুক্ত মডেল উন্মুক্তই থাকছে। তবে দুটি বাস্তব পরিণতি আছে।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি চুক্তি আছে এমন ক্লায়েন্টদের কাছে সফটওয়্যার বিক্রি করলে—বাংলাদেশের আউটসোর্সিং কাজের ভালো একটি অংশ ওই সরবরাহ শৃঙ্খলের কোথাও না কোথাও আছে—ধরে নিন জিজ্ঞাসা আসবে, আপনার পণ্যের ভেতরে কোন মডেল। সৎ উত্তর দিতে হলে জানতে হবে, অর্থাৎ পণ্যটি কোন কোন মডেল ও সংস্করণের ওপর নির্ভরশীল তার নথি রাখতে হবে। আজ এটি পাঁচ মিনিটের একটি কাগজ, পরে অস্বস্তিকর একটি ই-মেইল।

দ্বিতীয়ত, খরচের ব্যবধানটি বাস্তব, আর এ কারণেই উন্মুক্ত মডেল এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রন্টিয়ার মডেলের দাম দিতে না পারা ঢাকার কোনো স্টার্টআপ উন্মুক্ত মডেলের ওপর বানিয়ে পণ্য ছাড়তে পারে। ঝুঁকি এই নয় যে তা অবৈধ হয়ে যাবে; ঝুঁকি হলো রপ্তানি বাজারে উন্মুক্ত বিকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে—তাই এমনভাবে নকশা করা দরকার, যাতে মডেল বদলে ফেলা যায়, জুড়ে বসানো না থাকে।

নজির হিসেবে এর গুরুত্ব

এ নির্দেশের সবচেয়ে দূরপ্রসারী দিকটি ডিপসিক নয়, বরং যুক্তি-কাঠামোটি। কোনো মডেল কোন দেশের, তার ভিত্তিতে সরকারি ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ঠিক করার নজির একবার তৈরি হলে অন্য দেশও তা অনুসরণ করতে পারে—আর তখন প্রশ্নটি আর নিরাপত্তার থাকে না, বাণিজ্যের হয়ে যায়।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি অস্বস্তিকর, কারণ এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে মার্কিন ও চীনা—দুই ধরনের প্রযুক্তিই ব্যবহার করে। বিশ্ব যদি দুটি আলাদা এআই-ব্যবস্থায় ভাগ হয়ে যায়, তবে রপ্তানিমুখী সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানকে এক সময় বেছে নিতে হবে—আর সেই বাছাই কারিগরি যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে না।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।