কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ওয়াশিংটন আর বেইজিংয়ের বিরোধ এখন কেবল কে সেরা মডেল বানাল তা নিয়ে নয়। বিরোধটা এখন—বাকি বিশ্ব কার প্রস্তাব নেবে তা নিয়ে। আর এই প্রশ্নে সংখ্যাগুলো দ্রুত এক দিকেই সরেছে।
এক বছরে বদলে যাওয়া বাজার
মডেলগুলোতে ট্রাফিক পাঠানো বাজার ওপেনরাউটারের তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ব্যবহারে চীনা মডেলের হিস্যা প্রায় এক বছরে ১৫ শতাংশের নিচ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশের বেশি হয়েছে, সামনে থেকে টেনেছে ডিপসিক। ব্যবহারকারীদের মধ্যে মার্কিন কোম্পানিও আছে—এয়ারবিএনবি, ডোরড্যাশ ও শপিফাই সবাই চীনা মডেল নিয়েছে, আর কারণটাও যে কারও যা হতো তা-ই: খরচ কম, আর নিজের মতো বদলে নেওয়ার স্বাধীনতা বেশি।
সুবিধাগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রেরই: পথিকৃৎ গবেষণাগার, সবচেয়ে উন্নত চিপ, সবচেয়ে গভীর পুঁজি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ মাসে বলেছেন, "এআইয়ে যে জিতবে, সে-ই জিতবে"। কিন্তু মার্কিন প্রস্তাবটি হলো বিদেশি ক্লাউডে চলা একটি মালিকানাধীন ব্যবস্থার সাবস্ক্রিপশন, আর চীনা প্রস্তাবটি একটি ফাইল—যা নামিয়ে, বদলে, নিজের যন্ত্রে চালানো যায়, কোনো লাইসেন্স ফি ছাড়াই।
দুটি জোট, দুটি সদস্যতালিকা
বিভাজনটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এআই সরবরাহব্যবস্থায় চীননির্ভরতা কমাতে গত বছর ট্রাম্প গড়েছেন প্যাক্স সিলিকা জোট, যাতে সই করেছে দুই ডজনের বেশি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জুলাইয়ে সি চিন পিং চালু করেছেন পাল্টা একটি সংগঠন—ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন—আর তাতে টেনেছেন রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ ২৯টি দেশ।
দ্য চায়না-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টের প্রধান সম্পাদক এরিক ওলান্ডার ব্যবহারিক কথাটি বলেন: ধনী বিশ্বের বাইরের কোনো ডেভেলপারের কাছে সস্তা একটি চীনা মডেল হয়তো সেই সামান্য বেশি সক্ষম ব্যবস্থার চেয়ে বেশি কাজের, যেটির জন্য দামি সাবস্ক্রিপশন আর বিদেশি ক্লাউডে প্রবেশাধিকার লাগে। তিনি এ-ও বলেন, টাকাটা আসলে কোথায় জমতে পারে—ডিপসিক বা মুনশটে নয়, বরং হুয়াওয়ে, জেডটিই আর তাদের চারপাশে সেবা জোগানো প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
তাঁর তুলনাটি মনে রাখার মতো। "মোবাইল ফোনের দৌড়ে কি অ্যাপল জিতছে?"—তিনি জিজ্ঞেস করেন; অ্যাপলের পণ্য ব্যবহারকারী কম, কিন্তু মুনাফার বেশির ভাগই অ্যাপলের ঘরে। এই পাঠে সম্ভাব্য পরিণতি হলো—মুনাফা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, আর ব্যবহারকারী জমবে চীনের।
ক্রেতা আসলে যে প্রশ্নটি করছে
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হুতং রিসার্চের চুচেং ফেং বিষয়টিকে এক বাক্যে এনেছেন: আপনি কি দশ গুণ দামি কিন্তু ছয় মাস এগিয়ে থাকা মডেল চান, নাকি এক-দশমাংশ দামি কিন্তু ছয় মাস পিছিয়ে থাকা মডেল? সক্ষমতা যত কাছাকাছি আসছে, বেশির ভাগ ব্যবসার কাছে সামনের সারি আর তার পরের ধাপের ব্যবধানের চেয়ে বিলের অঙ্কটাই বড় হয়ে উঠছে।
চীনা প্রস্তাবের ফাঁকি
উন্মুক্ততা চিরস্থায়ী কোনো নিশ্চয়তা নয়, আর খানিকটা তা দুর্ঘটনাক্রমেই এসেছে। উন্নত চিপে মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আর তুলনামূলক ছোট পুঁজিবাজার চীনা ডেভেলপারদের ঠেলে দিয়েছে ওপেন মডেলের দিকে, প্রতিযোগিতায় টেকার উপায় হিসেবে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স কলভিল মনে করেন, মডেল যত শক্তিশালী হবে এই অবস্থান তত বদলাবে: প্রযুক্তি রপ্তানি করে প্রভাব বাড়াতে চায় বেইজিং, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তাই আগে—আর সম্ভাব্য পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং লাইসেন্সের নিয়ম দিয়ে কোথায় কোন মডেল ব্যবহার করা যাবে তা বেঁধে দেওয়া। রোডিয়াম গ্রুপের রেভা গুজোঁ ঝুঁকিটি সোজা করে বলেন—চীনের কৌশল ততক্ষণই আকর্ষণীয়, যতক্ষণ মডেলগুলো গ্রহণ ও নিজের মতো করে নেওয়ার মতো খোলা থাকে।
এ সপ্তাহের ট্রাম্প-সি বৈঠক থেকে এসেছে একটি প্রস্তাবিত এআই নিরাপত্তা বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা আর আনুষ্ঠানিক সংলাপে রাজি হওয়া—এর বেশি কিছু নয়। জাতিসংঘেও ছকটি একই ছিল, যেখানে অল্টম্যান ও আমোদেই বৈশ্বিক মানদণ্ড চাইলে মার্কিন প্রতিনিধিদল তা নাকচ করে।
বাংলাদেশে এর মানে কী
যে দেশগুলোকে পক্ষ বেছে নিতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ঠিক তাদেরই একটি; আর সৎ উত্তরটি হলো—কোনো একটিকেই একচেটিয়াভাবে বেছে নেওয়া উচিত নয়। হিসাবটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয়: ঢাকার একটি স্টার্টআপ সামনের সারির এপিআইয়ের দাম মেটাচ্ছে ডলারে, এমন একটি দেশ থেকে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার টানাটানি—অথচ ওই টোকেনগুলো সে ভাড়া করা জিপিইউতে ওপেন মডেল চালিয়েই বানাতে পারত। এ কারণেই নীতি ঘোষণা হোক বা না হোক, এখানে ওপেন ওয়েটই স্বাভাবিক পছন্দ—আর এ কারণেই মডেলের তালিকার চেয়ে এ সপ্তাহে লেখা ডেটা সেন্টার নির্মাণের দৌড় এই অঞ্চলের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্ধান্ত নিতে বসা যে কারও জন্য তিনটি কথা। এক, গড়ুন ইন্টারফেসের ওপর, ভেন্ডরের ওপর নয়—কোড যদি সরাসরি একটি সরবরাহকারীর এসডিকে ডাকে, তবে আপনি অজান্তেই পক্ষ বেছে ফেলেছেন। দুই, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে আলাদা করে বাংলা আউটপুট যাচাই করুন; ইংরেজি বেঞ্চমার্কে যতটা মনে হয়, বাংলায় মডেলগুলোর ব্যবধান তার চেয়ে অনেক বেশি, আর তালিকা দেখে তা বোঝা যাবে না। তিন, নাগরিকের তথ্য ছোঁয় এমন যেকোনো কাজে বেঞ্চমার্কের শেষ কয়েক পয়েন্টের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন দেশের ভেতরে মডেলটি চালাতে পারার সক্ষমতাকে—কারণ সেটি ওপেন মডেল দেয়, সাবস্ক্রিপশন দেয় না।




