প্রযুক্তি

চীনের "আলুর রাজধানী" এখন সার্ভার খামার: ভেতরের মঙ্গোলিয়ার যে প্রান্তরে কংক্রিটে ঢালা হচ্ছে এআই প্রতিযোগিতা

উলানকাবে সস্তা জমি, ঠান্ডা আবহাওয়া আর বিপুল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ—তাই সেখানে ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স আর ডিপসিক। এক প্রকৌশলীর ভাষায়, বছরে এক ধাপ, সামনে আরও অনেক। পেছনে পরিকল্পনা: ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের ৯০ শতাংশ শিল্পে এআই।

চীনের "আলুর রাজধানী" এখন সার্ভার খামার: ভেতরের মঙ্গোলিয়ার যে প্রান্তরে কংক্রিটে ঢালা হচ্ছে এআই প্রতিযোগিতা

ভেতরের মঙ্গোলিয়ার তৃণভূমির শহর উলানকাব বছরের পর বছর ছিল চীনের সরকারি "আলুর রাজধানী"। সেই খেতগুলো এখন নির্মাণস্থল। হলুদ হেলমেট পরা শত শত শ্রমিক ঝালাইয়ের ফুলকির পাশ দিয়ে যন্ত্রপাতি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, ক্রেন বসাচ্ছে ছাদ—তৈরি হচ্ছে ডেটা সেন্টার, বছরে এক ধাপ করে। "এটাই চায়না স্পিড," বিবিসিকে বলেন এক শ্রমিক; নিজের দেশকে তিনি বলেন "অবকাঠামো-পাগল"। এক বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীর কথা আরও নির্দিষ্ট: "প্রতিবছর একটা করে ধাপ। এটা দ্বিতীয় ধাপ। এরপর আরও অনেক ধাপ আসবে।"

তৃণভূমিতেই কেন

চীন শত শত ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে—হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স, ডিপসিকসহ নানা প্রতিষ্ঠানের জন্য—তার কম জনবসতির প্রদেশগুলোতে: উত্তরে উলানকাব, নিংশিয়া ও গানসু, দক্ষিণ-পশ্চিমে গুইঝৌ। যুক্তিটা ভৌত। ওই অঞ্চলগুলোতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের বিপুল সক্ষমতা আগে থেকেই আছে, জমি সস্তা, আর আবহাওয়া ঠান্ডা—অর্থাৎ ঠান্ডা রাখতে পানি লাগে অনেক কম। ডেটা সেন্টার শেষ পর্যন্ত এমন এক ভবন, যা বিদ্যুৎকে বদলে দেয় গণনা আর তাপে; আর এগুলোই সেসব জায়গা, যেখানে বিদ্যুৎ সবচেয়ে সস্তা আর তাপ ছাড়া সবচেয়ে সহজ।

বেইজিং এগুলো দিয়ে কী চায়

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ভবনগুলো অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আর ঘোষিত এক লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায়: ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিল্প ও সমাজে এআই ঢুকিয়ে দেওয়া। এগুলোর ভেতরের গণনাক্ষমতাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।

চীন মানুষও গড়ছে। ইয়েল ও কেমব্রিজে পড়ার পর উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে দেশে ফেরানো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়নার জ্যাক ঝাং বিবিসিকে বলেন, স্রোত উল্টে গেছে: "কম শিক্ষার্থী ও গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, আর বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে ফিরছেন। এটা খুব স্পষ্ট।" তাঁর ফেরার কারণ ব্যবহারিক—গবেষণাগারের এআই কাজ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসায় প্রয়োগ করতে "বেশি সম্পদ, বেশি লোকবল আর কখনো কখনো বেশি সরকারি সহায়তা লাগে, যা বিদেশে পাওয়া কঠিন হতে পারে।"

কৌশল হিসেবে ওপেন মডেল

বেইজিং তার এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠেলছে সাশ্রয়ী, ওপেন সোর্স মডেলের দিকে—যা যে কেউ নামিয়ে নিজের মতো বদলে নিতে পারেন; ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের বন্ধ পদ্ধতির ঠিক উল্টো, যেখানে নকশার খুঁটিনাটি গোপন থাকে। এর পেছনে যতটা বিশ্বাস, ততটাই বাধ্যবাধকতা: ভাগাভাগির কারণেই সবচেয়ে উন্নত চিপ থেকে বঞ্চিত থেকেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগোতে পেরেছে। শি চিন পিং বারবার বৈশ্বিক এআই নিয়ন্ত্রণ আর অন্যদের অনুসরণযোগ্য একটি কাঠামোর ডাক দিয়েছেন—অর্থাৎ সফটওয়্যারের পাশাপাশি নিয়মও লেখার দাবি।

এই প্রেক্ষাপটেই এই সপ্তাহের হোয়াইট হাউস শীর্ষ বৈঠক। "যে এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে," গত সপ্তাহে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেই চীনে উন্নত চিপ ও যন্ত্রপাতি বিক্রির মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে সতর্ক করেছেন, চীন এগিয়ে গেলে তা "যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য মারাত্মক বিপদ" হবে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস এসব আশঙ্কাকে চীনের উত্থান "ঠেকানোর" জন্য "শীতল যুদ্ধের কৌশল" বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক

দুটি, দুটোই ব্যবহারিক। এক, ওপেন ওয়েট: বাংলাদেশের ডেভেলপার ও শিক্ষার্থীরা বাস্তবে যে মডেলগুলো চালানোর সামর্থ্য রাখেন—ডিপসিক, কিউয়েন, লামা পরিবার—সেগুলোর অস্তিত্বই ওপরের ওপেন সোর্স কৌশলের কারণে। কৌশলটি টিকে গেলে এআইয়ের সস্তা প্রান্তটি উন্নত হতে থাকবে; দুই সরকারের সমঝোতায় তা সংকুচিত হলে সস্তা প্রান্ত থেমে যাবে, আর যে দেশের চিপও নেই, ডেটা সেন্টারও নেই, সে তা টের পাবে সবার আগে।

দুই, ভৌত শিক্ষাটি। উলানকাব বেছে নেওয়া হয়েছে সস্তা বিদ্যুৎ, ঠান্ডা বাতাস আর উদ্বৃত্ত জমির জন্য। বাংলাদেশে তিনটির একটিও নেই: বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল ও আমদানি করা জ্বালানিনির্ভর, জলবায়ু গরম ও আর্দ্র, আর ঢাকার কাছে জমির দাম তার ওপর তোলা ভবনের চেয়েও বেশি। এ দেশে গুরুতর কোনো এআই ডেটা সেন্টার না থাকার আসল কারণ এটাই, আর "স্মার্ট" অর্থনীতি নিয়ে যত নীতিবাক্যই লেখা হোক, হিসাবটা বদলায় না। দেশটি বাস্তবে যে স্তরের মালিক হতে পারে তা ওপরের স্তর—অ্যাপ্লিকেশন, বাংলা ডেটা, সেবা—যার জন্য ট্রান্সফরমার নয়, প্রকৌশলী লাগে।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।