হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি অপরিবর্তিত। মন্ত্রীর একটি বাক্য—এক টাকার পণ্য ৫০ পয়সায় কেন, তা মানুষকে ভাবতে হবে—পাঁচ বছর পরেও আলোচনার যোগ্য। কেন, তা মূল প্রতিবেদনের নিচে।
ই-কমার্স নিয়ে আলাদা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করার কথা আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তবে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
আজ বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী এই আলোচনার কথা জানান। এ সময় তিনি গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও কথা বলেছেন।
টিপু মুনশি বলেন, ‘ইভ্যালি গ্রাহকদের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছে, মনে হচ্ছে তারা গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। কারণ, হয় ইভ্যালি টাকা সরিয়ে নিয়েছে, না হয় বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করেছে। খেলাধুলাসহ বিভিন্ন জায়গায় স্পনসর করেছে। এখন তাদের কাছে মনে হয় টাকা নেই। তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগও নেই।’
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনতে নতুন একটি আইন করা নিয়েই আজ সচিবালয়ে চার মন্ত্রী বৈঠকে বসেন। অর্থ, বাণিজ্য, আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এসব কথা বলেন।

এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে একটি ডিজিটাল ই-কমার্স আইন করা হবে। আর যাঁরা ই-কমার্স ব্যবসা করতে চান, সবাইকে নিবন্ধিত হবে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ই-কমার্স বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে মানুষকেও সচেতন হওয়া জরুরি। এক টাকার একটি পণ্য কীভাবে ৫০ পয়সায় দেওয়া হয়, এসব নিয়ে মানুষকে চিন্তা করতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন কেউ ই-কমার্স ব্যবসায় এলে তাকে নজরদারি করা হবে। কোথাও এমন লোভনীয় অফার দেওয়া হয় কি না, তা দেখভাল করা হবে। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে কাজে লাগানো হবে। আর মানি লন্ডারিং আইন ও ডিজিটাল অ্যাক্টে সংশোধন আনা হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানকে জেলে পাঠানো সমাধান নয়। ইভ্যালির ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা যাতে টাকা ফেরত পান, সরকার সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও যাতে শাস্তি পায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে কয়েক হাজারের মতো ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। সার্বিকভাবে ই–কমার্স খাতকে খারাপ বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেন টিপু মুনশি।
এরপর যা হলো
হালনাগাদ, সেপ্টেম্বর ২০২৬। আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেষ পর্যন্ত হয়নি; তার বদলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ কার্যকর করে, যাতে অগ্রিম টাকা পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পেমেন্ট গেটওয়ের এসক্রোতে থাকে; ২০২২ সালে আসে ডিজিটাল বিজনেস আইডি ও কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল। ইভ্যালির ক্ষেত্রে মন্ত্রীর আশঙ্কাই সত্যি হয়: হাইকোর্টের নিয়োগ দেওয়া পর্ষদ পায়, কোম্পানির দায় সম্পদের বহু গুণ, আর ২০২১ সালে অগ্রিম টাকা দেওয়া গ্রাহকদের বেশির ভাগ টাকা ফেরত পাননি। শামীমা নাসরিন ২০২২ সালে জামিন পেয়ে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে ইভ্যালি নতুন করে চালু করেন; মোহাম্মদ রাসেল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পান। এসক্রো ব্যবস্থায় আটকে থাকা টাকার একটি অংশ পরে গেটওয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া হয়, যা এই সংকটে সরকারের একমাত্র সরাসরি প্রতিকার।
“মানুষকেও সচেতন হতে হবে”—বাক্যটি কতটা ঠিক
কথাটিতে একটি সত্য আছে। বাজারদরের অর্ধেক দামে মোটরসাইকেল বিক্রি দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়, আর যাঁরা অর্ডার করেছিলেন তাঁদের অনেকেই ঝুঁকিটি আন্দাজ করেছিলেন।
কিন্তু বাক্যটি দায়ভারের দিকটিও সরিয়ে দেয়, আর সেখানেই আপত্তি। ছাড়গুলো লুকানো ছিল না। সেগুলোর প্রচার হয়েছিল জাতীয় টেলিভিশনে, খেলার আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতায়, তারকাদের দিয়ে। একজন ক্রেতা যখন দেখেন একটি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে, বড় পরিসরে, বছরের পর বছর ব্যবসা করছে আর কোনো নিয়ন্ত্রক তাতে বাধা দিচ্ছে না, তখন সেটিকে বৈধ ধরে নেওয়া অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি ক্রেতার পাটিগণিত নয়। প্রশ্নটি হলো, অগ্রিম টাকা নিয়ে মাসের পর মাস পণ্য না দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বিঘ্নে বিজ্ঞাপন দিয়ে যেতে পারল।
টাকা কোথায় গেল—উত্তরটি মন্ত্রীর কথাতেই
একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, টাকা হয় সরানো হয়েছে, নয়তো বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতায় খরচ হয়েছে।
দ্বিতীয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটি গোপন কিছু নয়—বিজ্ঞাপন সবাই দেখেছে। গ্রাহকের অগ্রিম টাকায় বিপণন চালানো মানে নতুন গ্রাহক আনতে পুরোনো গ্রাহকের টাকা খরচ করা, আর সেটিই এই ধরনের ব্যবসার সংজ্ঞা। অর্থাৎ ধসের প্রমাণ ধসের আগেই প্রকাশ্যে ছিল; পড়তে জানলেই হতো।
যা হয়েছে, যা হয়নি
ওই বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর ভাগ্য এক রকম হয়নি। ই-কমার্সের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেষ পর্যন্ত হয়নি; বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ব্যবস্থাপনাতেই থেকেছে। নিবন্ধনের দিকটি এগিয়েছে—ডিজিটাল ব্যবসার জন্য পরিচিতি নম্বর চালু হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কাজে লেগেছে, তবে তার সামর্থ্যের সীমা অভিযোগের সংখ্যার তুলনায় ছোট।
যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে কম আলোচিত হয়েছিল, কার্যত সেটিই গ্রাহকের ঝুঁকি বদলে দিয়েছে: অনলাইন অর্ডারের অগ্রিম টাকা এখন পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত পেমেন্ট গেটওয়ের কাছে আটকে থাকে।
টাকার হিসাব আছে টাকাগুলো সব গেল কই লেখাটিতে।




