বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ, আর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেনালাইসিস ১১৭টি দেশের তথ্য নিয়ে ‘দ্য ২০২৬ জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো রিপোর্ট’ প্রকাশ করেছে, যেখানে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টো ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম। ভারত ৬ষ্ঠ, পাকিস্তান ২৫তম, শ্রীলঙ্কা ৮২তম।
আসল খবর যে সংখ্যাটি
গত বছর বাংলাদেশ ছিল ১৩তম। এক সংস্করণেই ৪৩ ধাপ নেমে যাওয়া অবস্থানটির চেয়েও বড় কথা, আর তা মন দিয়ে পড়া দরকার—কারণ সূচকটি যা মাপে, বেশির ভাগ মানুষ ধরে নেন অন্য কিছু।

তালিকাটি তৈরি চারটি উপাদানে—সার্ভিস ফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার কার্যক্রম, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ও অন-চেইন ব্যালেন্স—আর সময়কাল ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন। হিসাব করা হয় মাথাপিছু জিডিপি ধরে। এই ওজনই পুরো তালিকার চাবি। উন্নয়নশীল কোনো দেশের মোট অঙ্ক কম হলেও তা ধনী দেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, কারণ তুলনাটি হয় ওই দেশের মানুষের সামর্থ্যের সঙ্গে, ডলারের মোট অঙ্কের সঙ্গে নয়।
তাই বড় পতনের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশিরা ক্রিপ্টো ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। সমানভাবেই হতে পারে অন্য দেশগুলো দ্রুত বেড়েছে, কিংবা চারটি উপাদানের মধ্যে অনুপাত বদলেছে। প্রতিবেদনটি নিজেই বৈশ্বিক ছবিটিকে মোটামুটি স্থির বলছে: মোট বাজারমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমলেও অন-চেইন অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ—৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন থেকে ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে বিটকয়েন সর্বোচ্চ দামে উঠেছিল, এরপর ডলারের হিসাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়ে শীর্ষ থেকে ৬৭ হাজার ডলার পর্যন্ত নেমে আসে।
সূচকের শীর্ষে ব্রাজিল—প্রায় ২৫২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো অর্থনীতি নিয়ে, আর প্রতিটি উপসূচকেই এগিয়ে।
আইনি অবস্থান, আর বাস্তবে তার মানে
ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না, তাই এর বিপরীতে কোনো আর্থিক দাবি স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব লেনদেন অনুমোদন করে না, অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাও করে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন জরুরি পার্থক্যটি টেনেছেন: লেনদেন বৈধ নয়, নিষেধাজ্ঞা কঠোর; তবে চেনালাইসিসের সূচক আইনি স্বীকৃতি বিশ্লেষণ করে না। এটি মাপে তৃণমূলে কতটা বাস্তব কার্যক্রম ঘটছে—আর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীরা যে অনানুষ্ঠানিকভাবে তা চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রতিবেদনে সেটিই ধরা পড়েছে।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দেশে ক্রিপ্টো ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৩ লাখ বলে দাবি করা হয়েছিল। বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপল ও লাইটকয়েন—সবই এখানে হাতবদল হয়।
যে পরিণতির কথা কেউ বলে না
‘নিষিদ্ধ অথচ বহুল প্রচলিত’ কথাটির বাস্তব মানে এই নয় যে ব্যবহারকারীদের ধরা হচ্ছে। মানে হলো, তাঁদের কোনো প্রতিকার নেই। কোনো এক্সচেঞ্জ ব্যালেন্স আটকে দিলে, পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেনে অপর পক্ষ টাকা নিয়ে কয়েন না দিলে, কিংবা ওয়ালেট খালি হয়ে গেলে অভিযোগ করার মতো নিয়ন্ত্রক নেই, আর আদালতে যাওয়ার শুরুটাও বৈধ অবস্থান থেকে হয় না। ভুক্তভোগীকে যে লেনদেনের বর্ণনা দিতে হবে, সেটিই নিষিদ্ধ।
স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা কিংবা স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ—দুটির চেয়েই এ অবস্থান খারাপ। এ কারণেই সূচকের সংখ্যাটির চেয়ে পেছনের প্রশ্নটি বেশি আগ্রহের: কয়েক লাখ মানুষ এমন একটি মাধ্যম ব্যবহার করছেন যাকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়, অর্থাৎ রাষ্ট্রেরও এতে কোনো দৃষ্টি নেই—প্রতারণায় নয়, পুঁজি পাচারে নয়, আর যে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় নিশ্চিতভাবেই এই হিসাবের অংশ, তাতেও নয়।
একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার, কারণ এ ধরনের প্রতিবেদন প্রায়ই ভুলভাবে পড়া হয়: সূচকে ওপরে থাকা কোনো অর্জন নয়, আবার নেমে যাওয়াও কোনো ব্যর্থতা নয়। এটি কেবল একটি পরিমাপ—কোথায় কতটা কার্যক্রম ঘটছে তার। নীতিনির্ধারকের জন্য আসল প্রশ্ন সংখ্যাটি নয়, বরং এই: যে লেনদেনগুলো ঘটছেই, সেগুলো দেখা যায় এমন ব্যবস্থায় আনা হবে, নাকি দেখা যায় না এমন অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হবে।
সম্পর্কিত: নিজের কাছে চাবি রাখার ঝুঁকি কেমন, যখন কেউ তা নিতে আসে।




