প্রযুক্তি

পনেরোজন মানুষ কেন এক টন বেতারযন্ত্র নিয়ে জনশূন্য দ্বীপে গেলেন — আর অ্যানটেনা বসানোর জন্য সমুদ্রসৈকতই কেন পৃথিবীর সেরা জায়গা

বঙ্গোপসাগরের জনমানবহীন এক তীরে বারো দিন চলেছিল এস২১ডিএক্স। দ্বীপ অভিযান কেন শহরের স্টেশনকে হারায়, তার পদার্থবিদ্যাই এই শখের বেশির ভাগটা ব্যাখ্যা করে।

পনেরোজন মানুষ কেন এক টন বেতারযন্ত্র নিয়ে জনশূন্য দ্বীপে গেলেন — আর অ্যানটেনা বসানোর জন্য সমুদ্রসৈকতই কেন পৃথিবীর সেরা জায়গা

১০ ডিসেম্বর সদরঘাট থেকে পনেরোজন মানুষ নিয়ে একটি লঞ্চ ভোলার উদ্দেশে ছাড়ে, আর কচ্ছপিয়া ঘাটে অপেক্ষায় ছিল একটি ট্রাক — তাতে প্রায় এক টন তাঁবু, সোলার প্যানেল, জেনারেটর, ব্যাটারি, ফিডার কেব্‌লের কুণ্ডলী আর অ্যানটেনা। এরপর ট্রলারে আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে তাঁরা নামেন তারুয়া-য় — চরফ্যাশনের দক্ষিণ প্রান্তের জনমানবহীন এক সৈকত, যেখানে মেঘনা সাগরে মিশেছে। পরের বারো দিন তাঁদের ঠিকানা ছিল একটি কলসাইন: এস২১ডিএক্স।

অ্যামেচার রেডিও আসলে কী

অ্যামেচার — বা “হ্যাম” — রেডিও একটি লাইসেন্সধারী শখ, যেখানে ব্যক্তি মানুষ বেতারের মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেন — মাঝখানে কোনো ইন্টারনেট নেই, কোনো অপারেটর নেই, কোনো নেটওয়ার্ক নেই। আনন্দটা এই নয় যে এটি কাজ করে, বরং এই যে একে কাজ করানো কঠিন। বাংলাদেশের সৈকত থেকে পাঠানো সংকেত টেক্সাসে পৌঁছায় কেবল তখনই, যখন অ্যানটেনা, শক্তি, সময় আর ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের অবস্থা — সবই সহযোগিতা করে। যিনি এমন একটি স্টেশন গড়ে তা ঘটাতে পারেন, তিনি আড্ডার চেয়ে ফলিত পদার্থবিদ্যার কাছাকাছি কিছু করেছেন।

প্রত্যেক লাইসেন্সধারী অপারেটরের একটি কলসাইন থাকে, যা ইস্যু হয় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের নিয়মে, আর উপসর্গটি দেশ চিনিয়ে দেয়। এস২১ মানে বাংলাদেশ। অপারেটর মাইক্রোফোনে চাপ দেওয়ামাত্র, যেকোনো মহাদেশে যিনি ওই দুটি অক্ষর শোনেন, তিনি কথোপকথনের একটি শব্দ শোনার আগেই জেনে যান সংকেতটি কোথা থেকে এল।

সংকেত অন্য মহাদেশে পৌঁছায় কীভাবে

এই অংশটিই বাকি সব ব্যাখ্যা করে, অথচ এটি কদাচিৎ বলা হয়।

হাই-ফ্রিকোয়েন্সি বেতার সরলরেখায় দিগন্ত পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায় না। ভূপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ৬০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে সূর্যের অতিবেগুনি আলো ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন ছিনিয়ে নিয়ে কয়েকটি আহিত স্তর রেখে যায় — আয়নোস্ফিয়ার। অল্প কোণে ওপরের দিকে পাঠানো এইচএফ সংকেত ওই স্তরগুলোতে বেঁকে আবার নিচে নেমে আসে, শত বা হাজার কিলোমিটার দূরে, যেখান থেকে ভূপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে আবার ওপরে ওঠে। এমন কয়েকটি লাফেই সংকেত পৌঁছে যায় অন্য মহাদেশে।

কোন স্তর বাঁকাবে, আর বাঁকাবে নাকি শুষে নেবে — তা অনবরত বদলায়। সবচেয়ে নিচের স্তরটি দিনের আলোয় নিম্ন কম্পাঙ্ক শুষে নেয় আর অন্ধকারে মিলিয়ে যায়; এ কারণেই নিচের ব্যান্ডগুলো রাতে খোলে আর ভোরে চুপ হয়ে যায়। সবচেয়ে ওপরের স্তরটি সূর্যই টিকিয়ে রাখে, তাই ওপরের ব্যান্ডগুলো কাজ করে দিনে, আর যেসব পথে সূর্য উঠে আছে সেখানে। আর গোটা ব্যাপারটি ওঠানামা করে এগারো বছরের সৌরচক্র ধরে: সৌর সর্বোচ্চের কাছাকাছি সময়ে ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল বেশি আয়নিত থাকে, ব্যবহারযোগ্য কম্পাঙ্ক ওপরে ওঠে, আর শান্ত বছরে যে যোগাযোগ অসম্ভব তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। ডিএক্সপেডিশনের পঞ্জিকা খানিকটা এই চক্র ধরেই ঠিক হয়।

দ্বীপ কেন, আর সৈকতই কেন

যন্ত্রপাতি তীরে নিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব কারণ আছে, আর তা দৃশ্যের সৌন্দর্য নয়।

উল্লম্ব অ্যানটেনার নিচে কাজ করার মতো একটি পরিবাহী তল দরকার — গ্রাউন্ড প্লেন। শুকনো মাটিতে এর মানে ডজনখানেক রেডিয়াল তার পুঁতেও মাঝারি মানের ফল পাওয়া, কারণ মাটি দুর্বল পরিবাহী এবং প্রেরিত শক্তির বড় অংশ মাটি গরম করতে গিয়ে নষ্ট হয়। লবণাক্ত পানি চমৎকার পরিবাহী। পানির কিনারায় দাঁড়ানো একটি উল্লম্ব অ্যানটেনা বিনা খরচে প্রায় নিখুঁত গ্রাউন্ড প্লেন পেয়ে যায়, এবং শক্তি সোজা ওপরে নষ্ট না করে দূরপাল্লার প্রোপাগেশনের জন্য দরকারি নিচু কোণে বিকিরণ করে। ঢাকার উঠানে যে অ্যানটেনা সাধারণ, বাধাহীন সমুদ্রপথসহ সৈকতে সেটিই হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ একটি স্টেশন।

এ কারণেই দ্বীপ অভিযান অনেক বেশি বাজেটের স্থায়ী স্টেশনকেও হারিয়ে দেয়, আর এ কারণেই ট্রলারে এক টন যন্ত্রপাতি বয়ে নেওয়া সার্থক।

আইল্যান্ডস অন দি এয়ার

আইওটিএ দীর্ঘদিনের একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচি, যেখানে দ্বীপে অবস্থিত স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অপারেটররা কৃতিত্ব অর্জন করেন; বিশ্বের দ্বীপগুলোকে এতে দলে দলে তালিকাভুক্ত করা আছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছরই বাংলাদেশ একটি আইওটিএ অভিযান চালিয়ে আসছে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি বছরে মাত্র সাত দিনের জন্য এস২১ডিএক্স বিশেষ কলসাইনটি ইস্যু করে।

দুষ্প্রাপ্যতাই গোটা কৌশল। কলসাইনটি বছরে এক সপ্তাহ টেকে বলেই প্রতিটি মহাদেশের অপারেটররা সারা বছর অপেক্ষা করেন এর সঙ্গে একটি যোগাযোগ নথিবদ্ধ করতে — এ কারণেই নেমেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডজনখানেক অ্যানটেনা উঠে যায়, আর দল সারা রাত পালা করে কাজ করে। দুষ্প্রাপ্য কোনো স্টেশন দেখা দিলে একসঙ্গে শত শত অপারেটর ডাকতে থাকেন; স্টেশনটি তখন “স্প্লিট” চালায়, অর্থাৎ যে কম্পাঙ্কে পাঠায় তার চেয়ে ভিন্ন কম্পাঙ্কে শোনে, আর সারিটি নিয়মমাফিক সামলায়। প্রতিটি যোগাযোগ পরে নিশ্চিত করতে হয় — চিরাচরিতভাবে ছাপানো কিউএসএল কার্ড বিনিময়ে, আর এখন মূলত ইলেকট্রনিক লগিং ব্যবস্থায় — কারণ অনিশ্চিত যোগাযোগ কোনো হিসাবেই গোনা হয় না।

বাংলাদেশে লাইসেন্স কীভাবে পাবেন

কয়েক দশক ধরে ব্যক্তি নাগরিকের জন্য সম্প্রচার বন্ধ ছিল; সত্তরের দশকের কোনো উৎসাহী একটি রিসিভার বানিয়ে শুনতে পারতেন, এর বেশি নয়। বাংলাদেশ অ্যামেচার রেডিও লিগ বছরের পর বছর শখটি উন্মুক্ত করতে চাপ দিয়েছে, আর ১৯৯২ সালে ফাউন্ডেশন ফর অ্যামেচার ইন্টারন্যাশনাল রেডিও সার্ভিসের সহায়তায় ঢাকায় একটি মার্কিন লাইসেন্স পরীক্ষা নেওয়া হয়।

আজ বিটিআরসি প্রতিবছর অ্যামেচার রেডিও পরীক্ষা নেয়। পাস করুন, শর্ত পূরণ করুন, আর নিজের এস২১ কলসাইন পেয়ে যান। দেশের যে অল্প কয়েকটি কারিগরি লাইসেন্স একজন কিশোরও কেবল যোগ্যতার জোরে অর্জন করতে পারেন, এটি তার একটি — আর পাঠ্যসূচিটি (বিধিবিধান, মৌলিক ইলেকট্রনিকস, প্রোপাগেশন, পরিচালনপদ্ধতি) নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বেতার প্রকৌশলের সত্যিকারের পরিচিতি।

এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ কেন

ঘূর্ণিঝড়ে মোবাইল টাওয়ার পড়ে গেলে লাইসেন্সধারী অপারেটররা সেই অল্প কয়েকজনের মধ্যে থাকেন যাঁরা তখনো বার্তা আদান-প্রদান করতে পারেন — কারণ যে স্টেশন একটি ব্যাটারি আর একটি তারে চলে, ঝড় যা সরিয়ে দিতে পারে এমন কোনো অবকাঠামোর ওপর সেটি নির্ভর করে না।

সঙ্গে সৎ সীমাগুলোও বলা দরকার। অ্যামেচার রেডিও বহন করে কণ্ঠস্বর আর সামান্য তথ্য, ছবি বা ডেটাবেইস নয়; এর জন্য দরকার আগে থেকেই লাইসেন্সধারী ও অভ্যস্ত অপারেটর, কারণ দুর্যোগের মুহূর্ত শেখার উপযুক্ত সময় নয়; আর এটি সরকারি দুর্যোগ-যোগাযোগের বিকল্প নয়, পরিপূরক। তবু যে দেশের উপকূল কয়েক বছর পরপর ডোবে, সেখানে যে শখ মানুষকে সৌরশক্তি দিয়ে সৈকতে একটি সচল স্টেশন দাঁড় করাতে শেখায়, তা স্মৃতিকাতরতা নয়। তা জমিয়ে রাখা একটি দক্ষতা।

সূত্র: International Telecommunication Union, RSGB Islands On The Air, BTRC, Bangladesh Amateur Radio League, propagation references

লিখেছেন

Miraj S

টেক বিডিতে প্রযুক্তির ব্যবসা নিয়ে লেখেন মিরাজ এস — বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতি, ই-কমার্স, টেলিকম, যন্ত্রাংশের দাম আর সেগুলোর পেছনের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ঢাকার বাজারদরের নিয়মিত হিসাব তিনিই রাখেন—অর্থাৎ ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গেই তা তাঁকে জানানো হয়।