প্রযুক্তি

বাংলাদেশের দুধের কার্বন পদচিহ্ন ধারণার চেয়ে ২৭ শতাংশ কম, কারণটা যা ভাবছেন তা নয়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের গবেষণা, প্রকাশ ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের সঙ্গে। প্রকৃত হিসাব আগের অনুমানের চেয়ে ২৭ শতাংশ কম—আর গরুর উৎপাদনশীলতা বাড়াতেই খামারের কার্বন কমেছে ৩৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের দুধের কার্বন পদচিহ্ন ধারণার চেয়ে ২৭ শতাংশ কম, কারণটা যা ভাবছেন তা নয়

খাদ্য উৎপাদনের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মাপা হয় কার্বন পদচিহ্ন দিয়ে—কোনো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে জুড়ে থাকা পরিবেশগত খরচ। নতুন এক গবেষণায় বাংলাদেশের ডেইরি খামারের দুধের জন্য অনেক বেশি নিখুঁত একটি হিসাব পাওয়া গেছে, আর তা আগের অনুমানের চেয়ে ২৭ শতাংশ কম।

গবেষণাটি হয়েছে কীভাবে

গবেষণাটি যৌথভাবে করেছে ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা; প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ডেইরি সায়েন্সে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাকৃবির ডেইরি ফার্ম থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাবটি তৈরি।

ওই খামারে নির্গমন আসে যেখান থেকে: গরুর পরিপাক প্রক্রিয়া থেকে প্রায় ৪৮ শতাংশ, খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সার থেকে ২৪ শতাংশ, গোবর ব্যবস্থাপনা থেকে ২০ শতাংশ এবং খামার পরিচালনার শক্তি থেকে ৮ শতাংশ। মানসম্মত লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী দুধ না দেওয়া প্রাণীগুলোকেও হিসাবে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানী ইলিয়াস উদ্দিন জানান, খামারের উৎপাদনব্যবস্থার অংশ হওয়ায় সেগুলো বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।

কাগজে দক্ষিণ এশিয়ার দুগ্ধখামার কেন খারাপ দেখায়

প্রচলিত হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার ডেইরি খামারের কার্বন পদচিহ্ন অনেক বেশি দেখায়, আর এর পাটিগণিতটি সরল: ইউরোপ-আমেরিকার গরু দিনে ৩০ থেকে ৪০ লিটার দুধ দেয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের গরু দেয় ৪ থেকে ৮ লিটার।

তবে গবেষণায় কম সংখ্যাটির চেয়েও কাজের কিছু মিলেছে। পাঁচ বছরে উন্নত ব্যবস্থাপনা ও সুষম খাদ্যে গরুর উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ৬৩ শতাংশ—আর তাতেই খামারের কার্বন কমেছে ৩৭ শতাংশ। নির্গমন কমেছে উৎপাদন বাড়ায়, কিছু কেটে বাদ দেওয়ায় নয়।

ইলিয়াস উদ্দিনের মূল কথাটিও এটাই: উন্নয়নশীল দেশে কেবল নির্গমন কমানোর কৌশলের চেয়ে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোই আসল চাবিকাঠি।

হিসাব করার সমস্যা

বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় একটি পর্যবেক্ষণও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মাংস ও দুধের খামার আলাদা ব্যবসা। বাংলাদেশে গবাদিপশু পালা হয় দুই উদ্দেশ্যেই। ফলে বাংলাদেশের খামারে মোট নির্গমনের মাত্র ৫০ শতাংশ দুধ উৎপাদনের হিসাবে ধরা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা প্রায় ৯০ শতাংশ। এই সমন্বয় না করে দুটোর তুলনা করা মানে আলাদা জিনিসের তুলনা করা।

গবেষকেরা মানুষের পুষ্টির জন্য উৎপাদিত ক্যালোরির এককপ্রতি কার্বনের হিসাবও করেছেন, যা অবশেষে ন্যায্য তুলনার সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশে এর মানে কী

ফলটি কেতাবি কিছু নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবেশগত মানদণ্ড কড়া হওয়ায় ক্রেতারা ক্রমেই কার্বনের হিসাব চাইছেন, আর নিজের তথ্য না থাকলে কোনো দেশের ঘাড়ে চাপে অন্যের ধরে নেওয়া সংখ্যা—যা এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ভুল দিকে ২৭ শতাংশ ভুল ছিল।

এ থেকে দুটি কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের খামার নয়, বাণিজ্যিক খামারেও এই পরিমাপ করতে হবে; কারণ বাকৃবির খামার বেশির ভাগের চেয়ে ভালোভাবে চলে, আর তা দিয়ে বানানো জাতীয় হিসাব টিকবে না। আর উৎপাদনশীলতার ফলটিই আসল নীতি: সুষম খাদ্য ও ভালো পশু ব্যবস্থাপনা লিটারপ্রতি নির্গমন কমায়, আবার খামারির আয়ও বাড়ায়—এমন হস্তক্ষেপ বিরল, যা কাউকে কিছু ছাড়তে বলে না। যে খাতে তর্কটা সাধারণত জীবিকা বনাম জলবায়ু, সেখানে ৬৩ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ৩৭ শতাংশ কার্বন হ্রাস সবচেয়ে জোরালো যুক্তি—আর তা এসেছে বাংলাদেশের তথ্য দিয়ে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে, এটুকুই লক্ষ করার মতো।

সূত্র: প্রথম আলো

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।