এক দশক ধরে ঢাকার নির্বাহীদের ফোন ছিল ব্ল্যাকবেরি: কি-বোর্ড, লাল বাতির ঝলক আর বিবিএম — অফিসের সবাই যে মেসেঞ্জারে ছিলেন। ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি সেই যুগ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে। ব্ল্যাকবেরি লিমিটেড নিশ্চিত করেছে, ওই তারিখ থেকে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমে চলা ফোনগুলো “আর নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করবে না”।
কোন ফোনগুলো বন্ধ হচ্ছে
বন্ধের আওতায় ব্ল্যাকবেরি ওএস ৭.১ ও তার আগের সংস্করণ, ব্ল্যাকবেরি ১০, আর প্লেবুক ওএস ২.১ ও তার আগের সংস্করণ — অর্থাৎ বিক্রি হওয়া প্রতিটি বোল্ড, কার্ভ, টর্চ, কিউ১০, জেড১০, পাসপোর্ট ও ক্লাসিক। ৪ জানুয়ারির পর এগুলোতে কল করা, এসএমএস পাঠানো, মোবাইল ডেটা বা ওয়াই-ফাই ব্যবহার, এমনকি জরুরি নম্বরে ফোন করাও ব্যর্থ হতে পারে। হাতের যন্ত্রটি হয়ে দাঁড়ায় ব্যাটারিসহ একটি কি-বোর্ড।
ব্ল্যাকবেরি নাম বহন করলেও অ্যান্ড্রয়েডে চলা ফোনগুলো — টিসিএলের লাইসেন্সে বানানো কি-ওয়ান ও কি-টু — এর আওতায় নয়। অন্য যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতোই সেগুলো চলবে, যদিও টিসিএল ২০২০ সালেই এগুলো বানানো বন্ধ করেছে।
সার্ভার বন্ধ হলে ফোন মরে যায় কেন
বারো বছরের পুরোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও কল হয়। সেটি অনিরাপদ, অ্যাপ হালনাগাদ হয় না, ব্রাউজার আধুনিক সাইটে ব্যর্থ হয় — তবু চলে। ব্ল্যাকবেরি চলে না, আর পার্থক্যটি বয়সের নয়, স্থাপত্যের।
ব্ল্যাকবেরির যে সুবিধাটি একে করপোরেট মান বানিয়েছিল, তা হলো এটি অন্য ফোনের মতো কেবল মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করত না। ডেটা ট্রাফিক যেত ব্ল্যাকবেরির নিজস্ব অবকাঠামো দিয়ে — গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে কোম্পানির নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টারে সংকুচিত, এনক্রিপ্ট ও রিলে হয়ে। ধীরগতির সংযোগে বিখ্যাত সেই ব্যাটারি আয়ু, সবার আগে পৌঁছানো পুশ ইমেইল, আর ব্যাংক ও সরকারে যন্ত্রটিকে ঢুকিয়ে দেওয়া নিরাপত্তার নিশ্চয়তা — সবই এসেছিল এখান থেকেই।
এর মানে ছিল, ফোনটি স্বয়ংসম্পূর্ণ যন্ত্র নয়। এটি ছিল একটি সেবার টার্মিনাল। ইমেইল, বার্তা, ব্রাউজারসহ অনেক কিছুই নির্ভর করত কোম্পানির চালানো সার্ভারের সঙ্গে সজীব একটি সম্পর্কের ওপর — আর যে যন্ত্র সেগুলোতে পৌঁছাতে পারে না, সেটি দুর্বল হয়ে পড়া ফোন নয়; সেটি সার্ভারবিহীন একটি ক্লায়েন্ট।
কাজেই এই বন্ধ হওয়া অবহেলা নয়। এটি এমন একটি নকশার বিল, যা বছরের পর বছর সত্যিকারের সুবিধা দিয়েছে আর যার কেন্দ্রে ছিল একটি নির্ভরতা — আর কোম্পানিটি ফোন কোম্পানি থাকা বন্ধ করতেই বিলটি এসে পড়েছে।
যেভাবে এখানে পৌঁছাল
কানাডার ওয়াটারলুভিত্তিক ব্ল্যাকবেরি ২০১৩ সালে নিজেদের পুরোনো সফটওয়্যারের জায়গায় আনে ব্ল্যাকবেরি ১০ — আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েডের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার দেরিতে নেওয়া চেষ্টা। ব্যবহারকারীরা সঙ্গে যাননি। ২০১৫ সালে তারা নিজেদের ফোন অ্যান্ড্রয়েডে নেয়, ২০১৬ সালে হার্ডওয়্যার তুলে দেয় টিসিএল ও এক ভারতীয় অংশীদারের হাতে, আর ২০১৮ সালের অক্টোবরের পর ব্ল্যাকবেরি ব্র্যান্ডের নতুন কোনো ফোন আসেনি। টেক্সাসের স্টার্টআপ অনওয়ার্ডমোবিলিটি ২০২১ সালে ৫জি ব্ল্যাকবেরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; সেটি কখনো আসেনি।
কোম্পানিটি অবশ্য উবে যাচ্ছে না। বহু বছর আগেই শেষ ফোন বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানটি এখন সরকার ও করপোরেশনের জন্য নিরাপত্তা সফটওয়্যার বানায় — লাখ লাখ গাড়ির ভেতরের কিউএনএক্স ব্যবস্থাসহ।
ড্রয়ারে এখনো একটি থাকলে
- এখনই পরিচিতি ও ছবি সরান। সেবা বন্ধ হলে রপ্তানির সহজ পথগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইউএসবিতে কম্পিউটারে সব কপি করুন, কিংবা পরিচিতির তালিকা ভিকার্ড ফাইল হিসেবে নিজেকে ইমেইল করুন।
- সিমটি যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ভরুন। আপনার নম্বর, বিকাশ আর ব্যাংকের ওটিপি আগের মতোই চলবে; অবসরে যাচ্ছে কেবল হ্যান্ডসেটটি।
- সচল ফোন বলে বিক্রি করবেন না। ঢাকার সেকেন্ড-হ্যান্ড তালিকায় এখনো ব্ল্যাকবেরি ১০ যন্ত্র আছে; ৪ জানুয়ারির পর সেগুলো সংগ্রাহকের জিনিস।
- ফেলে না দিয়ে রিসাইকেল করুন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি ব্র্যান্ডের সেবাকেন্দ্র ই-বর্জ্য নিষ্পত্তির জন্য পুরোনো হ্যান্ডসেট নেয়।
যে অংশটি ২০২২ সালে থেমে থাকেনি
শিক্ষাটি প্ল্যাটফর্মটির চেয়ে বেশি দিন টিকেছে, আর আজ বিক্রি হওয়া বিপুল পরিমাণ যন্ত্রের ক্ষেত্রেই তা খাটে।
যা-ই কিনুন, জিজ্ঞেস করুন: নির্মাতার সার্ভার না থাকলে এটি কী করবে? ফোন, স্পিকার, ক্যামেরা, থার্মোস্ট্যাট, গাড়ির কোনো সুবিধা — প্রতিটিই বসে আছে এমন একটি রেখার কোথাও না কোথাও, যার এক প্রান্তে আছে এমন যন্ত্র যা কেবল যুক্তও হতে পারে, আর অন্য প্রান্তে এমন টার্মিনাল যা একা কাজ করতেই পারে না। প্রথমটি খারাপভাবে হলেও চলতে থাকে। দ্বিতীয়টি থেমে যায়।
পণ্যের পাতা দেখে এই প্রশ্নের উত্তর কদাচিৎ মেলে, যা নিজেই তথ্যবহুল — আর এরপর কয়েকবারই কঠিনভাবে এই প্রশ্ন করা ও উত্তর পাওয়া গেছে: সেবা বন্ধ হওয়ায় নীরব হয়ে যাওয়া স্মার্ট স্পিকার, অধিগ্রহণের পর অকেজো হওয়া ফিটনেস ট্র্যাকার, হালনাগাদে তুলে নেওয়া গাড়ির সুবিধা। ব্ল্যাকবেরির এই বন্ধ হওয়া সেই ধরনটির স্পষ্টতম আদি উদাহরণ, যা এরপর সাধারণ হয়ে গেছে — আর সবাই যেটির কথা মনে রাখে, সেই কি-বোর্ড কখনোই মরে যাওয়া জিনিসটি ছিল না।




