‘এআই: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ইন টেক জার্নালিজম’ শীর্ষক একটি সেমিনার সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকার একটি রিসোর্টে। যৌথ আয়োজক সেন্টার ফর টেকনোলজি জার্নালিজম (সিটিজে) ও ওপাস কমিউনিকেশন্স লিমিটেড।
বক্তারা বলেছেন, এআই প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরিতে এর ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, একই সঙ্গে পেশাগত দক্ষতা, নির্ভুল তথ্য ও দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আলোচনা হয়েছে এআই-সমন্বিত সফটওয়্যারের ব্যবহার, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এআইয়ের প্রয়োগ নিয়ে।
যা বলা হয়েছে
সিটিজের সভাপতি হাসান জাকির বলেছেন, প্রথাগত পদ্ধতির সাংবাদিকতা দিয়ে এখন টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে; ডিজিটাল দুনিয়ায় টিকে থাকতে সাংবাদিকদের এআইসহ সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে—আর এই দক্ষতাই নতুন সুযোগ এনে দেবে।
সিটিজের মহাসচিব সাইফ আহমাদ ব্যবহারিক সুবিধার কথা তুলেছেন, বিশেষ করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে: এ প্রযুক্তি বিশ্লেষণে প্রয়োজনীয় সময় কমিয়ে সাংবাদিকদের কাজ আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।
ওপাস কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল কাফী এআই-সমন্বিত সফটওয়্যারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় যুক্ত পেশাজীবীদের এসব সফটওয়্যারের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন।
লেখক ও সিটিজের সদস্য রাহিতুল ইসলাম জাপান ও চীনের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ‘এআই আমাদের জন্য নতুন সুযোগ এনেছে। এআইয়ের কারণে সাংবাদিকদের চাকরি হারানোর ভয় নেই; বরং এআই সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’
সিটিজের সদস্য ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশেষ প্রতিনিধি কাজী সোহাগ বলেছেন, প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে; গণমাধ্যমকর্মীদেরও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, নইলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সেমিনারের পাশাপাশি দিনব্যাপী নানা আয়োজনে অংশ নেন সিটিজের সদস্যরা। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগ প্রযুক্তি সাংবাদিকদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় ও যোগাযোগ বাড়াবে এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে পেশাগত মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।
একমত হওয়াটাই সমস্যা
প্রত্যেক বক্তা পৌঁছেছেন একই জায়গায়: এআই একটি সুযোগ, খাপ খাও নয়তো পিছিয়ে পড়ো। কথাটি সম্ভবত সত্য, আর একই সঙ্গে একটি সংবাদকক্ষ যা যা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে কম কাজেরও। ‘এআইয়ে দক্ষ হও’ একটি মনোভাব। সংবাদকক্ষের দরকার একটি দস্তাবেজ।
কারণটি ঝুঁকির সরল হিসাব। একজন প্রতিবেদক তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত করতে মডেল ব্যবহার করলেন, নিরানব্বইবার সেটি ঠিক হলো—কিছুই হলো না। শততমবারে সেটি একটি সংখ্যা, একটি মামলা বা একটি উদ্ধৃতি বানিয়ে দিল, আর কাগজ তা ছেপে দিল—তখন খরচটি একটি সংশোধনী নয়। খরচটি পাতার বাকি সবকিছুর বিশ্বাসযোগ্যতা।

সেই চারটি লাইন
কী খসড়া করা যাবে। শিরোনাম, সারসংক্ষেপ, অনুবাদ, প্রতিবেদক আগেই জানেন এমন খবরের গঠন—এগুলোয় ঝুঁকি কম। যেখানে মডেল ভাষা নয়, তথ্য জোগান দেয়, সেটি আলাদা শ্রেণি।
কী যাচাই করতেই হবে, আর কে করবেন। মডেলের ভেতর দিয়ে যাওয়া প্রতিটি সংখ্যা, নাম, তারিখ ও উদ্ধৃতি মূল সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন এমন একজন মানুষ, যাঁর নাম ফাইলে লেখা থাকবে। ‘আমরা জিনিস যাচাই করি’ নয়—নির্দিষ্ট একজন, নথিবদ্ধ।
পাঠককে কী জানানো হবে। স্বচ্ছতার নিয়ম আগেই ঠিক করা, কেউ প্রশ্ন করার পর বানানো নয়। অনুবাদ যন্ত্রের সহায়তায় হলে তা লিখুন। ছবি উৎপাদিত হলে ক্যাপশনেই লিখুন—কেউ পড়ে না এমন নীতি-পাতায় নয়।
কোনটা কখনো বাইরে যাবে না। অপ্রকাশিত সূত্র-উপাদান কোনো সাধারণ চ্যাটবটে পেস্ট করা মানে তা তৃতীয় পক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। গোপন সূত্র আছে এমন প্রতিবেদকের জন্য এটি গোপনীয়তার প্রশ্ন নয়, নিরাপত্তার।
পরের আয়োজনে নেওয়ার মতো দুটি বিষয়
প্রথম, সমস্যার উল্টো দিকে যাচাইয়ের যন্ত্র এখন আছে। গুগলের এআই-শনাক্তকরণের পোর্টাল এখন যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন, যা জমা পড়া ছবি সামলানো ডেস্কের সরাসরি কাজে লাগে—তবে বড় শর্ত হলো, অংশগ্রহণকারী জেনারেটর যেসব ছবিতে জলছাপ বসিয়েছে, নির্ভরযোগ্যভাবে কেবল সেগুলোই এটি ধরতে পারে।
দ্বিতীয়, এআইয়ের কারণে সাংবাদিকদের চাকরি যাবে না—রাহিতুল ইসলামের এই কথাটি ঘোষণা নয়, পরীক্ষা করার মতো। বেশি সম্ভাব্য ঝুঁকিটি প্রতিস্থাপন নয়, ক্ষয়: মডেল যদি খসড়া করে, সার করে, বিশ্লেষণ করে, তবে প্রতিবেদক ধীরে ধীরে সেই কাজটি করা বন্ধ করেন যা তাঁকে নিয়োগের যোগ্য করেছিল। এটি বাস্তব ও মাপা যায় এমন প্রভাব—ভাবনার কাজ এআইকে দিয়ে দেওয়ার নীরব মূল্য নিয়ে আমরা গতকালই লিখেছি—আর সংবাদকক্ষে এটি আসে ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে নয়, বিচারবোধ গড়ে ওঠেনি এমন নবীন প্রতিবেদকদের মধ্য দিয়ে।
এর কোনোটিই সেমিনারের বিপক্ষে যুক্তি নয়। বাংলাদেশের প্রযুক্তি সাংবাদিকেরা এ নিয়ে বসছেন—না বসার চেয়ে এটি ভালো। তবে পরের আয়োজনের কাজের ফল হবে এক পৃষ্ঠার একটি নীতি, যা সংবাদকক্ষ সত্যিই দেয়ালে টাঙাতে পারে।




