প্রযুক্তি স্বাস্থ্য

দুটি চিপ বানাচ্ছে নিউরালিংক—একটি দিয়ে চিন্তায় কম্পিউটার চালানো, আরেকটি দিয়ে দৃষ্টি ফেরানো

মাস্কের দাবি, ব্লাইন্ডসাইটের প্রকৌশল-কাজ শেষ, এখন অপেক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের। দুটিই তারহীন ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস।

দুটি চিপ বানাচ্ছে নিউরালিংক—একটি দিয়ে চিন্তায় কম্পিউটার চালানো, আরেকটি দিয়ে দৃষ্টি ফেরানো

ইলন মাস্কের ব্রেন-ইমপ্লান্ট প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক জানিয়ে দিয়েছে, বাজারে তারা কোন দুটি পণ্য আনতে চায়—টেলিপ্যাথি ও ব্লাইন্ডসাইট। দুটিই তারহীন ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস চিপ। গুরুতর স্নায়বিক জটিলতায় ভোগা কয়েকজনের শরীরে প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে তাদের যন্ত্র বসিয়েছে।

টেলিপ্যাথি

এটিই তাদের প্রথম পরিকল্পিত পণ্য। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী শুধু চিন্তা করেই দূর থেকে কম্পিউটার বা অন্য যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আর কথা না বলে বা না লিখে নির্দিষ্ট কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।

এ নিয়ে মাস্কের দাবিটি গতির—কয়েক বছরের মধ্যে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের গতি মানুষের কথা বলা বা দ্রুত টাইপ করার চেয়েও বেশি হবে। এ অংশটি সাবধানে নেওয়াই ভালো। চিন্তা দিয়ে কার্সর নিয়ন্ত্রণ একাধিক গবেষক দল দেখিয়েছেন; কিন্তু কথোপকথনের গতিতে চিন্তা থেকে ভাষা—নির্ভরযোগ্যভাবে এবং গবেষণাগারের বাইরে—এখনো দেখা যায়নি।

ব্লাইন্ডসাইট

দ্বিতীয় পণ্যটির লক্ষ্য, যেকোনো কারণে দৃষ্টি হারানো মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা—মাস্কের দাবি অনুযায়ী, জন্ম থেকে অন্ধ মানুষেরও। তিনি বলেছেন, প্রকৌশলের কাজ শেষ, চিপটি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায়।

টেলিপ্যাথি, এরপর ব্লাইন্ডসাইট
একটি দিয়ে চিন্তা করেই কম্পিউটার চালানো। আরেকটি দৃষ্টি ফেরানোর—মাস্কের দাবি, জন্মান্ধদেরও। প্রকৌশল শেষ, অপেক্ষা অনুমোদনের। গ্রাফিক: টেক বিডি।

জন্মান্ধদের ক্ষেত্রে দাবিটিই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, আর কেন তা বোঝা দরকার। যিনি পরে দৃষ্টি হারিয়েছেন, তাঁর দৃষ্টি-কর্টেক্স চোখ থেকে আসা সংকেতের মানে বুঝতে আগেই শিখেছে; তাই সংকেত পাঠানো যন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সঙ্গেই কাজ করে। কিন্তু জন্ম থেকে অন্ধ কারও ক্ষেত্রে সেই ব্যাখ্যা করার কাঠামোটিই গড়ে ওঠেনি। সেখানে কাজে লাগার মতো দৃষ্টি ফেরানো শুধু প্রকৌশলের সমস্যা নয়, স্নায়ুবিজ্ঞানেরও—আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সবচেয়ে কড়া নজর পড়বে এই দাবিটির ওপরেই।

‘প্রকৌশল শেষ’ মানে কী, আর কী নয়

যন্ত্র তৈরি হয়ে যাওয়া অনুমোদন-প্রক্রিয়ার শেষ নয়, শুরু। মস্তিষ্কের ভেতরে বসানো ইমপ্লান্ট পর্যালোচনা হয় দীর্ঘ সময় ধরে, আর প্রশ্নগুলো বছরের পর বছরের—টিস্যু কেমন সাড়া দেয়, ইলেকট্রোডগুলো কাজের থাকে কি না, যন্ত্র বদলাতে হলে কী হয়, আর উপকারের তুলনায় অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি কতটা।

পণ্যের নাম ঘোষণা মানেও বাজারে আসার তারিখ নয়। নিউরালিংক দুটি চিপের নাম ও কাজ জানিয়েছে, কিন্তু কোনটি কতটা ভালো কাজ করে তা বাইরের কেউ যাচাই করতে পারেন—এমন ক্লিনিক্যাল তথ্য প্রকাশ করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কেন গুরুত্বপূর্ণ

এ ধরনের যন্ত্র বাংলাদেশের মতো বাজারে পৌঁছায় দেরিতে ও চড়া দামে, আর প্রথম দিকে মেলে বিদেশের হাতে গোনা কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে। তবু বিষয়টির দিকে চোখ রাখা দরকার অন্য কারণে। যে ইন্টারফেস হারানো সক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়, সেটিই আবার স্নায়বিক তথ্য নিয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো তোলে—কী রেকর্ড হচ্ছে, কোথায় জমা থাকছে, আর কে তা পড়তে পারবে। এই নিয়মগুলো সাধারণত লেখা হয় যেসব দেশ আগে অনুমোদন দেয় সেখানে, আর বাকি সবাই তা উত্তরাধিকার সূত্রে পায়।

প্রমাণ বলতে কী বোঝাবে

চমকপ্রদ প্রদর্শনী দেখানো এই ক্ষেত্রটিতে কাজের মাপকাঠিগুলো আসলে নিরুত্তাপ। টেলিপ্যাথির ক্ষেত্রে—মিনিটে কত শব্দ, কত সময় ধরে টানা, কতজন ইমপ্লান্ট নেওয়া ব্যবহারকারীর মাধ্যমে, আর প্রথম মাস থেকে দ্বাদশ মাসে নির্ভুলতা কতটা কমে। ব্লাইন্ডসাইটের ক্ষেত্রে—আলো টের পাওয়া যাচ্ছে কি না তা নয়, বরং আকৃতি এতটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কি না, যাতে আগে করতে না পারা কোনো কাজ করা যায়।

এই সংখ্যাগুলোই নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে যাবে, আর স্বাধীন গবেষকেরাও এগুলোর প্রকাশ চাইবেন। সেগুলো না আসা পর্যন্ত পণ্যের নাম আর প্রকৌশল-পর্ব শেষ হওয়ার ঘোষণা সামর্থ্য নয়, ইচ্ছার কথাই বলে—পরের ঘোষণাটি এলে এই পার্থক্যটিই মনে রাখা দরকার।

সূত্র: প্রথম আলো, টাইমস অব ইন্ডিয়া

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।