প্রযুক্তি

সাত বছর ধরে নেপালে চলছে পাঠাও — দক্ষিণ এশীয় প্ল্যাটফর্ম কেন একটি সীমান্ত পেরোতে পারে আর পরেরটি প্রায় কখনোই পারে না, তার নীরব উদাহরণ

কাঠমান্ডুতে পর্যটকেরা চলাফেরা করেন ঢাকার একটি অ্যাপে। কৌতূহলের বিষয় ২০১৮ সালে সীমান্ত পেরোনো নয়, বরং নেপালকে কী পেরোনোযোগ্য করেছিল এবং এমন বাজারের তালিকা কেন এত ছোট।

সাত বছর ধরে নেপালে চলছে পাঠাও — দক্ষিণ এশীয় প্ল্যাটফর্ম কেন একটি সীমান্ত পেরোতে পারে আর পরেরটি প্রায় কখনোই পারে না, তার নীরব উদাহরণ

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুর ফ্লাইটে সময় লাগে প্রায় একশো মিনিট। নেমে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের বিনা মূল্যের ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত হলেই ঢাকার যানজটের জন্য রাখা অ্যাপটি জানিয়ে দেয়, এখানেও সে চলে। কয়েক মিনিট পর গাড়ি নিয়ে পার্কিংয়ে হাজির হন একজন চালক। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে চলছে পাঠাও, যা একে দেশের বাইরে সেবা চালানো প্রথম বাংলাদেশি অন-ডিমান্ড পরিবহন কোম্পানি বানিয়েছে — আর মাঠের চিত্র দেখে একে পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে স্থায়ী ব্যবস্থাই বেশি মনে হয়।

সেখানে আসলে কী চলে

বাংলাদেশে যেভাবে শুরু করেছিল, নেপালেও পাঠাও সেভাবেই ঢুকেছে: আগে বাইক। সরু রাস্তা, তীব্র যানজট আর পেছনে বসে চলায় অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর শহরে মোটরসাইকেল হেইলিংই কাজ করে, আর এতে বহরের দরকার হয় না — সম্পদটি এমন একটি মোটরসাইকেল যা আগে থেকেই কারও মালিকানায়। এরপর এসেছে গাড়ি, খাবার সরবরাহ ও পার্সেল সেবা। এখন সেবা চলে কাঠমান্ডু, ললিতপুর, চিতওয়ানসহ আরও কয়েকটি শহরে, আর রাজধানী থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরের নাগরকোটের মতো পাহাড়ি শহর পর্যন্ত।

চালকেরা বলেন, ভালো দিনে আয় হয় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার নেপালি রুপি, যার বড় অংশ বিমানবন্দর থেকে যাত্রী তোলা থেকে। উল্লেখযোগ্য দিকটি গ্রাহকের গড়ন: বিদেশি পর্যটক, যাঁদের অনেকেই বাংলাদেশি ও ভারতীয়, অভ্যাসবশেই অ্যাপটি ব্যবহার করেন এবং ক্রমে একটিমাত্র যাত্রার বদলে সারা দিনের ঘোরাঘুরির জন্যও নেন। নেপালের পর্যটন অর্থনীতির দৈনন্দিন পরিবহনের একটি অংশ চলে ঢাকায় লেখা সফটওয়্যারে।

পর্যটক কেন হাত বাড়ান, আর স্থানীয়েরা কেন ভিন্ন কারণে

নেপালের বিমানবন্দরে বা ট্রেকিং শহরে ট্যাক্সি ভাড়া করা মানে দরকষাকষি, আর সেই দরকষাকষিতে বিদেশি প্রতিবারই হারেন। নির্দিষ্ট ভাড়া, মানচিত্র আর চালকের রেটিং তর্কটাই তুলে দেয়। এটি পর্যটকের সমস্যা, আর এ কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো জায়গাতেই অ্যাপ অসমভাবে বেশি জেতে বিদেশি যাত্রীদের কাছে।

স্থানীয়েরা ব্যবহার করেন ভিন্ন কারণে — পাওয়া যায় বলে — আর এখানে পাঠাও কয়েকটি বিকল্পের একটি। একই শহরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইনড্রাইভ, জুমজুম ও সাজিলো; বিশেষ করে ইনড্রাইভ চলে দর প্রস্তাবের মডেলে, যা ঠিক সেখানেই জনপ্রিয় যেখানে দরকষাকষি সাংস্কৃতিক রীতি। পাঠাও আধিপত্য করে না, নিজের জায়গা ধরে রাখে। প্রচলিত বর্ণনার চেয়ে এটিই সৎ বিবরণ, এবং বেশি প্রশংসনীয়ও — বিদেশি বাজারে স্থানীয় প্রতিষ্ঠিতদের বিরুদ্ধে অংশ ধরে রাখা সেখানে ঢোকার চেয়ে কঠিন।

নেপালকে কী পেরোনোযোগ্য করেছিল

এই অংশটিই সাধারণীকরণের যোগ্য, কারণ এটিই ব্যাখ্যা করে প্রথম বিদেশি বাজার কেন সচরাচর কঠিন নয় আর দ্বিতীয়টি কেন সাধারণত কঠিন।

পণ্যটি যেসব চলক-নির্ভর, তার প্রায় সবকটিতেই নেপাল বাংলাদেশের সঙ্গে মিলে গেছে। ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী, বাজে যানজট, মোটরসাইকেল-অধ্যুষিত রাস্তা, সস্তা স্মার্টফোন, এখনো প্রচলিত নগদ লেনদেন, একই স্তরের আয়, আর দুই চাকার হেইলিংয়ে কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই — উবার ও গ্র্যাব দুটিই গাড়িকে কেন্দ্র করে গড়া, আর কাঠমান্ডুর জন্য কেউই লড়েনি। মুদ্রা ভারতীয় রুপির সঙ্গে বাঁধা, যা দাম নির্ধারণ থেকে বিনিময় হারের ঝুঁকির বড় অংশ সরিয়ে দেয়। এমনকি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিও বন্ধ ছিল না, খোলা ছিল: ঢাকার মতো সেখানেও নিয়ম আসার আগেই রাইড হেইলিং এসে গিয়েছিল।

তবু যেকোনো দেশেই বাজারে ঢুকতে লাগে একটি স্থানীয় কোম্পানি, স্থানীয় লেনদেনের অবকাঠামো, স্থানীয় সহায়তা দল, আর সবচেয়ে বড় কথা, বাজারের দুই দিকেই একসঙ্গে শূন্য থেকে শুরু করা — চালকবিহীন অ্যাপ কোনো যাত্রী খুলবেন না, আর যাত্রীবিহীন অ্যাপে কোনো চালক অপেক্ষা করবেন না। ভর্তুকি দিয়েই এই দেয়াল ভাঙতে হয়, আর যেকোনো সম্প্রসারণে ভর্তুকিই সবচেয়ে বড় খরচের খাত। নিজের বাজারের সঙ্গে মিলে যাওয়া বাজারে পণ্য, দামের যুক্তি ও পরিচালনার ছক আবার ব্যবহার করা যায়, কাজেই কিনতে হয় কেবল শুরুটুকু। যে বাজার মেলে না, সেখানে চারটিই নতুন করে বানাতে হয়।

এ কারণেই সহজ দ্বিতীয় দেশের তালিকা ছোট, আর এ কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার এত প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে নীরবে ফিরে আসে। যেগুলো টেকে, সেগুলো সাধারণত আয়, ঘনত্ব ও যানবাহনের ধরনে সংলগ্ন — কেবল মানচিত্রে সংলগ্ন নয়।

পরামর্শ, যা জটিল কিছু নয়

কী কী সঙ্গে নেওয়া যায় জিজ্ঞেস করলে পাঠাওয়ের নেতৃত্ব ও বাংলাদেশি কর্মকর্তারা একই সংক্ষিপ্ত তালিকা দেন: স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, বাইরে থেকে বসানো জিনিস না হয়ে ওই সমাজের সত্যিকারের কাজে লাগা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা রাখা, আর বড় হতে হতে আরও ভালো লোক নেওয়া। এর কোনোটিই নতুন নয়। বাজারের জন্য নয়, শিরোনামের জন্য সম্প্রসারণ ঘোষণা করা কোম্পানিগুলো ঠিক এই অংশটুকুই এড়িয়ে যায় — আর সেটিই সাধারণত মৃত্যুর কারণ।

সূত্র: Pathao, The Daily Star, Dhaka Tribune, Future Startup, Nepali Telecom, Prothom Alo

লিখেছেন

Miraj S

টেক বিডিতে প্রযুক্তির ব্যবসা নিয়ে লেখেন মিরাজ এস — বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতি, ই-কমার্স, টেলিকম, যন্ত্রাংশের দাম আর সেগুলোর পেছনের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ঢাকার বাজারদরের নিয়মিত হিসাব তিনিই রাখেন—অর্থাৎ ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গেই তা তাঁকে জানানো হয়।