প্রযুক্তি

মনোরোগবিদ্যার কোনো নির্দেশিকাই সামাজিক মাধ্যম আসক্তিকে স্বীকৃতি দেয় না। তর্কটি এখন আদালতে উঠেছে, আর তাতে ঝুঁকির মাত্রা বদলে গেছে

ডিএসএম-৫ ও আইসিডি-১১-তে এটি নেই। স্ট্যানফোর্ডের আনা লেমকি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মের সুবিধাগুলো বাধ্যতামূলক আসক্তি তৈরির জন্যই বানানো। দুটি কথাই একসঙ্গে সত্যি।

মনোরোগবিদ্যার কোনো নির্দেশিকাই সামাজিক মাধ্যম আসক্তিকে স্বীকৃতি দেয় না। তর্কটি এখন আদালতে উঠেছে, আর তাতে ঝুঁকির মাত্রা বদলে গেছে

কিছু চিকিৎসক সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারকে জুয়া বা নিকোটিনের সঙ্গে তুলনা করেন। আবার কারও মতে আসক্তি শব্দটি বড্ড সহজে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মতভেদটি সত্যিকারের, আর তা বোঝা দরকার—কারণ উত্তরটিই ঠিক করে, বিষয়টিকে কোন ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা হবে।

রোগনির্ণয়ের নির্দেশিকাগুলো যা বলে

কোনোটিই একে স্বীকৃতি দেয় না। সামাজিক মাধ্যম বা স্মার্টফোন "আসক্তি" নেই যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ চিকিৎসকদের ব্যবহৃত ডিএসএম-৫-এ, নেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস আইসিডি-১০ বা আইসিডি-১১-তেও।

এই অনুপস্থিতি অসতর্কতা নয়। আপত্তিটি সুনির্দিষ্ট: চিকিৎসাগত আসক্তি মানে তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর শনাক্তযোগ্য প্রত্যাহার-উপসর্গ, আর বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার সেই মাত্রা ছোঁয় কি না তা নিয়ে ঐকমত্য নেই। দুটি নির্দেশিকাই কিন্তু জুয়া-ব্যাধিকে স্বীকৃতি দেয়, আর আইসিডি-১১ যোগ করেছে গেমিং ব্যাধি—অর্থাৎ প্রমাণ যথেষ্ট মনে করলে সংস্থাগুলো আচরণগত আসক্তি যোগ করতে রাজি। এটির ক্ষেত্রে তারা করেনি।

অন্য পক্ষের যুক্তি

স্ট্যানফোর্ড স্কুল অব মেডিসিনের আসক্তি-চিকিৎসার মেডিকেল ডিরেক্টর আনা লেমকি আসক্তির সংজ্ঞা দেন "নিজের বা অন্যের ক্ষতি সত্ত্বেও কোনো বস্তু বা আচরণের ক্রমাগত বাধ্যতামূলক ব্যবহার" হিসেবে। এ সংজ্ঞায় বিপুল পরিমাণ স্ক্রলিংই পড়ে যায়, আর তাঁর অবস্থান হলো ডিজিটাল মাধ্যম অন্য আসক্তিকর আচরণের তুলনীয় ডোপামিন সাড়া তৈরি করে।

এ তর্ক শুরু হওয়ার পর যা বদলেছে, তা হলো মঞ্চটি। লেমকি সাক্ষ্য দিয়েছেন আদালতে—বলেছেন, প্ল্যাটফর্মের সুবিধাগুলো, যেমন অসীম স্ক্রল আর অ্যালগরিদমিক ব্যক্তিগতকরণ, ইচ্ছাকৃতভাবেই বাধ্যতামূলক করে বানানো; তাঁর ভাষায় এগুলো মানুষের সংযোগকে "ওষুধে পরিণত করে"।

এই বদলটি দেখতে যতটা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিভাষা নিয়ে গবেষকদের মতভেদ একাডেমিক বিষয়। পণ্যের নকশা নিয়ে মামলায় একই মতভেদ দায়-দায়িত্বের বিষয়, আর সেখানে প্রমাণের মানদণ্ডও আলাদা।

যে পরীক্ষাটিতে রোগনির্ণয় লাগে না

বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক লরেল উইলিয়ামস একটি ব্যবহারিক মাপকাঠি দেন: আপনার যদি মনে হয় উচিতের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন, আর কাজ, পড়াশোনা, শখ বা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—সেটিই সংকেত। ব্যবহারের পর নিয়মিত ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন বা খিটখিটে লাগাও আরেকটি।

সৎভাবে উত্তর দেওয়ার মতো তিনটি প্রশ্ন:

  1. কাজের মাঝখানে বারবার কি ফোন তুলে নিচ্ছি?
  2. কমানোর চেষ্টা করে কি ব্যর্থ হয়েছি?
  3. কতটা ব্যবহার করছি, তা নিয়ে কি অপরাধবোধ হয়?

তিনটিরই উত্তর হ্যাঁ হলে কিছু একটা বদলানো দরকার—যে নামেই কেউ ডাকুক। অতিরিক্ত ব্যবহার নিরীহ, এ তর্কে কেউই তা বলছেন না।

যা আসলে কাজে লাগে

প্রমাণ ইচ্ছাশক্তির চেয়ে কাঠামোগত বদলের পক্ষে, আর কারণটি সরল: পণ্যটি বানিয়েছেন এমন মানুষেরা, যাঁরা ইচ্ছাশক্তিকে হারানোর জন্যই সাজিয়েছেন।

  1. প্রতিটি সামাজিক অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। এটিই সবচেয়ে কার্যকর একক বদল: কখন দেখবেন সে সিদ্ধান্ত অ্যাপের হাত থেকে আপনার হাতে আসে।
  2. বাধা যোগ করুন। অ্যাপগুলো হোম স্ক্রিন থেকে সরান, কিংবা প্রতিবার ব্যবহারের পর লগআউট করুন। স্বয়ংক্রিয় আচরণের বিরুদ্ধে ছোট বাধা অস্বাভাবিক রকম ভালো কাজ করে।
  3. ফোনের সময়সীমা ব্যবহার করুন আর ফোনকেই আপনাকে আটকাতে দিন।
  4. শোবার ঘরে ফোন নয়। দিনের শেষ আর প্রথম আধা ঘণ্টাতেই বাধ্যতামূলক ব্যবহারের বেশির ভাগ থাকে।
  5. সরানো নয়, বদলে দিন। হাঁটা, বই, কাউকে ফোন। খালি জায়গাটি ভরে যায় সেই জিনিসেই, আপনি যা এড়াচ্ছিলেন।

লেমকির নিজের পরামর্শ আরও কঠিন: বেছে নেওয়া একটি আচরণ থেকে ৩০ দিনের পূর্ণ বিরতি, প্রতিদিনের হিসাব রেখে। যুক্তি হলো, ডোপামিনের স্বাভাবিক মাত্রা ফিরতে মোটামুটি এক মাস লাগে, আর আংশিক কমানোয় তা হয় না। পাঠকের ওটি দরকার, নাকি ওপরের নরম তালিকাটি—তা নির্ভর করে তিন প্রশ্নের কোনটিতে তিনি হ্যাঁ বলেছেন তার ওপর।

এর কোনোটিতেই পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হয় না। লক্ষ্য হলো ব্যবহারটিকে আবার সচেতন করে তোলা।

সূত্র: ডিএসএম-৫ ও আইসিডি-১১; আনা লেমকির প্রকাশিত কাজ ও আদালতের সাক্ষ্য; বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের লরেল উইলিয়ামস; আর প্রথম আলোর মূল প্রতিবেদন।

সূত্র: DSM-5, ICD-11, Anna Lembke (Stanford), Laurel Williams (Baylor), court testimony, Prothom Alo

লিখেছেন

Mahbub Rabbani

টেক বিডিতে ভোক্তা প্রযুক্তি নিয়ে লেখেন মাহবুব রব্বানী — ফোন, অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম আর দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের প্ল্যাটফর্ম। সাইটের কীভাবে-করবেন নির্দেশিকাগুলো তাঁর লেখা; কোনো পণ্যকে তিনি মাপেন কেনার খরচ দিয়ে নয়, ব্যবহারের খরচ দিয়ে।