বিশ্ব

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তিকে নীরবে ছাড়িয়ে গেল সৌরবিদ্যুৎ, পাকিস্তান ২ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে মানুষের নিজের পকেটের টাকায়

এক দশক আগে বিশ্বের বিদ্যুতের ১ শতাংশ ছিল সৌর। এ বছর তা প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছে পারমাণবিককে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য যে অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, তা ঘটছে পাশের দেশেই।

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তিকে নীরবে ছাড়িয়ে গেল সৌরবিদ্যুৎ, পাকিস্তান ২ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে মানুষের নিজের পকেটের টাকায়

এক দশক আগে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের উপস্থিতি ছিল প্রায় অনুল্লেখ্য—বিশ্বের বিদ্যুতের প্রায় ১ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ১০ শতাংশে পৌঁছাবে, আর ছাড়িয়ে যাবে পারমাণবিক শক্তিকে—যা সত্তরের দশকের শেষ থেকে বিদ্যুৎব্যবস্থার একটি স্তম্ভ।

যুক্তরাজ্যের জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এমবার-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে অল্প ব্যবধানে পারমাণবিককে ছাড়িয়ে যায় সৌরবিদ্যুৎ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বারো মাসে ব্যবধানটি আর অল্প নেই: পৃথিবীর সব পারমাণবিক কেন্দ্র মিলিয়ে যত বিদ্যুৎ, সৌর দিচ্ছে তার চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি।

এমবারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেভ জোনস বলেন, ‘বিশ্বের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা—এটা নিশ্চিতভাবেই একটা পাগলাটে পরিসংখ্যান।’

সবাই এটিকে কম মেপেছে

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির অধ্যাপক ইয়ান রোজেনো বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎই এখন বিদ্যুৎ-রূপান্তরের ইঞ্জিন।’ ‘এটি প্রত্যাশিত ছিল না।’

মূলধারার পূর্বাভাস বছরের পর বছর এটিকে ধরতে পারেনি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রক্ষেপণ, রোজেনোর ভাষায়, ‘সরলরৈখিক প্রবৃদ্ধি আর ধীরে কমতে থাকা খরচ ধরে নিয়েছিল, আর দুটোতেই ভুল করেছে’।

ভুলের মাত্রা বোঝা যায় দুটি সংখ্যায়। ২০০০ সাল থেকে পারমাণবিক উৎপাদন মোটামুটি অপরিবর্তিত। আর সৌর বেড়েছে প্রায় ২,৭০০ গুণ। কেবল ২০২৫ সালেই বিশ্বের বিদ্যুৎ চাহিদার বৃদ্ধির তিন-চতুর্থাংশ মিটিয়েছে সৌর, ছাড়িয়ে গেছে বায়ুবিদ্যুৎকেও।

২০০০ সাল থেকে ২,৭০০ গুণ
পারমাণবিক মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকতে থাকতে সৌর বেড়েছে এতটাই। প্যানেলের দাম এখন ১০০ ডলারের অনেক নিচে, চলে ৩০-৪০ বছর। গ্রাফিক: টেক বিডি।

‘আপত্তিকর রকম সস্তা’

২০২০ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ হয়ে ওঠে সৌর, আর এরপরও দাম কমেছে—দক্ষতা বেড়েছে, প্রতিটি প্যানেলে সিলিকন ও রুপার পরিমাণ কমেছে। রোজেনো বলেন, ‘চীনের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা আর বর্তমান অতিরিক্ত সরবরাহ মডিউলের দাম নামিয়ে এনেছে রেকর্ড নিচে।’

২০২৩-২৪ সালের বড় দরপতন নিয়ে এসেছে জোনসের ভাষায় ‘আপত্তিকর রকম সস্তা’ সৌরবিদ্যুতের যুগ। ‘প্যানেলটি নিজে এতটাই অবিশ্বাস্য সস্তা,’ তিনি বলেন। ‘দাম ১০০ ডলারের (৭৫ পাউন্ড) অনেক নিচে… আর সেটি আপনাকে কোনো রকম খরচ ছাড়াই ৩০-৪০ বছর বিদ্যুৎ দিয়ে যাবে।’

সাশ্রয় কেবল বিলে নয়। গবেষকদের হিসাবে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাড়তে থাকা বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ যুক্তরাষ্ট্রকে জলবায়ু ও স্বাস্থ্যগত সুফল এনে দিয়েছে ২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের (১৮ হাজার ৬০০ কোটি পাউন্ড)।

কোথায় বাড়ছে

চীন এখনো বহুদূর এগিয়ে, তবে গল্পটি আর কেবল তার নয়। শুল্ক সত্ত্বেও স্থাপনায় দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র, আর দেশটিতে এখন এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবারের বিদ্যুৎ জোগানোর মতো সৌর আছে—সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জেতা অঙ্গরাজ্যগুলোতেই।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অ্যালিসিয়া ঝাও বলেন, ‘সৌর এত দ্রুত বাড়তে পেরেছে কেন, তার একটি মূল কারণ অর্থনীতি। খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুতের সবচেয়ে সস্তা উৎসগুলোর একটি এখনো সৌর। আর রাজনৈতিক বিভাজন নির্বিশেষে এটি বসছেই।’

চীন যত দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়েছিল, ভারত ছাড়ছে তার চেয়েও দ্রুত: গত দুই বছরে বিদ্যুৎ চাহিদার বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ মিটিয়েছে নতুন সৌর। অস্ট্রেলিয়ায় ৪০ লাখেরও বেশি বাড়িতে ছাদের সৌর—সব পরিবারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। আফ্রিকাজুড়ে বসছে দিনে প্রায় ১ লাখ প্যানেল।

যে উদাহরণটি আসলে আমাদেরই

মন দিয়ে পড়ার মতো উদাহরণ পাকিস্তান, কারণ পরিস্থিতিগুলো আমাদের চেনা: ব্যয়বহুল ও অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থা, আর চীন থেকে আসা সস্তা প্যানেল।

২০১৯ সালে পাকিস্তানের বিদ্যুতের ২ শতাংশেরও কম আসত সৌর থেকে। এখন তা ২৪ শতাংশ।

আর চমকপ্রদ অংশটি পদ্ধতিতে। জোনস বলেন, ‘পাকিস্তানে সত্যিই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটি হলো… সৌর-জোয়ারের বেশির ভাগটাই এসেছে সাধারণভাবে মানুষের নিজের পকেট থেকে। মানুষ ঋণ না নিয়েই এটি কিনতে পারছে।’

কোনো জাতীয় কর্মসূচি এটি চালায়নি। কোনো ভর্তুকি প্রকল্প নয়, কোনো বিতরণ সংস্থার উদ্যোগ নয়, কোনো অপেক্ষা নয়। পরিবারগুলো প্যানেল কিনেছে, কারণ সে মাসে তাদের জন্য হিসাবটা মিলে গেছে।

রোজেনো বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ পরিবারগুলোকে সরকার বা বিতরণ সংস্থার জন্য অপেক্ষা না করেই কাজ করতে দেয়। অনিশ্চিত সময়ে সেই গতি ও স্বাধীনতার মূল্য বিপুল।’

লেবানন থেকে নাইজেরিয়া পর্যন্ত একই চিত্র, আংশিকভাবে যার পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে বেড়ে যাওয়া ডিজেলের দাম। দুর্বল বিদ্যুৎব্যবস্থার উত্তর যেখানে ছিল বাড়ির ডিজেল জেনারেটর, সেখানে এখন ছাদের প্যানেল। ইথিওপিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে পেট্রল ও ডিজেল গাড়ির আমদানিই নিষিদ্ধ করেছে।

এর অর্থ এখানে কী

বাংলাদেশ একই চীনা কারখানা থেকে আমদানি করে, একই ডিজেলের দাম দেয়, আর চালায় একই চাপে থাকা বিদ্যুৎব্যবস্থা। পাকিস্তানের সংখ্যাগুলো আমাদের জন্য পূর্বাভাস নয়, তবে একটি তর্কের নিষ্পত্তি সেগুলো করে দেয়: পারিবারিক সৌরবিদ্যুতের পথে বাধা আর প্যানেলের দাম নয়।

বাকি থাকে এর চারপাশের সবকিছু—মিটারিংয়ের নিয়ম, ভাড়াটের ছাদে ওঠার সুযোগ, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের খরচ, আর সাধারণ একটি পরিবার দীর্ঘ সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়া সংযোগ নিতে পারে কি না। এগুলো নীতি ও কাগজপত্রের সমস্যা, প্রযুক্তির সমস্যা নয়। আমরা তর্ক করতে করতেই প্রযুক্তিটি সস্তা হয়ে গেছে।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।