বহুল ব্যবহৃত একটি ভিসা-পথে স্থায়ীভাবে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ থেকে আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র—এর মধ্যে আছে মাইক্রোসফট, ভারতের ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো ও এইচসিএল টেকনোলজিস। পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রামের (পার্ম) নতুন ও বিচারাধীন সব আবেদন স্থগিত।
এই স্থগিতাদেশটিই কেন বেশি লাগে
এক প্রজন্ম ধরে পথটি ছিল একটি ছক: প্রকৌশলে ডিগ্রি, প্রযুক্তিসেবার চাকরি, যুক্তরাষ্ট্রে পোস্টিং, বারবার ভিসা নবায়ন, তারপর গ্রিন কার্ড—যা দেয় স্থায়ী বসবাসের অধিকার। বিশেষজ্ঞদের জন্য দেওয়া অস্থায়ী ভিসা এইচ-১বি-র সিংহভাগই ভারতীয়দের হাতে, আর তাকে স্থায়ী বসবাসে ও শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্বে রূপান্তরের জন্য তাঁরা নির্ভর করতেন পার্মের ওপর।
পার্ম স্থগিত করায় কাউকে দেশছাড়া করা হচ্ছে না। বন্ধ করা হচ্ছে পরিণতিটি। মানুষ থেকে যাচ্ছেন অস্থায়ী ভিসায়, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বাঁধা অবস্থায়—আর যে স্থায়িত্বকে ঘিরে পুরো পরিকল্পনাটি সাজানো ছিল, সেখানে পৌঁছানোর পথ নেই।

প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে এতে কিছু যায়-আসে না
ভারতের ৩০ হাজার কোটি ডলারের প্রযুক্তি খাতের বাণিজ্য সংগঠন ন্যাসকম বলছে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে আর স্থানীয়ভাবে নিয়োগ বাড়িয়েছে; ফলে ‘পার্ম প্রক্রিয়ায় এইচ-১বি থেকে স্থায়ী বসবাসে যাওয়া কর্মীর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে সীমিত’।
প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যও তা-ই বলছে। উইপ্রো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কর্মীদের ৮০ শতাংশের বেশি স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া। টিসিএস বলছে, গত দুই বছরে তাদের পার্ম আবেদন ছিল এক অঙ্কের ঘরে। মাইক্রোসফট বলছে, তারা এইচ-১বি ভিসার আবেদন করে মূলত বিদ্যমান কর্মী ধরে রাখতে, নতুন কর্মী আনতে নয়। পার্ম ট্র্যাকারের বরাতে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, টিসিএসের আবেদন ২০২৫–২৬ সালে নেমে এসেছে দুটিতে, আগের বছর যা ছিল ৫১৩ আর তার আগের বছর ১ হাজার ৮০৪; ইনফোসিস ও উইপ্রোর ২০২৫–২৬ সালের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি সিকিউরিটিজ মনে করছে আয়ে প্রভাব হবে সামান্য।
প্রভাব ও ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের জন্য কী করা হচ্ছে জানতে বিবিসি আটটি প্রতিষ্ঠানকেই ই-মেইল করেছিল। কেউ উত্তর দেয়নি।
দুটি কথাই সত্যি
প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব সত্যিই কম, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই মানিয়ে নিয়েছে। মানুষের ওপর প্রভাব মোটেই কম নয়, কারণ যাঁরা এখনো ওই পথে আছেন তাঁরা কিছুতেই মানিয়ে নেননি—তাঁরা বিশ বছরের পরিকল্পনা করেছিলেন পুরোনো নিয়ম ধরে। ১ হাজার ৮০৪টি আবেদন থেকে দুইয়ে নেমে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমানোর সাফল্য; একই সঙ্গে তা ১ হাজার ৮০২টি ব্যক্তিগত পরিকল্পনা, যেগুলো নীরবে অসম্ভব হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য পাঠ
বাংলাদেশে এ পথটি কখনোই বড় পরিসরে ছিল না। দেশের আইটি রপ্তানির গল্পটি বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য দূর থেকে কাজ করার, তাঁদের কাছে গিয়ে কাজ করার নয়—আর দুই ধরনের ঝুঁকিও বিপরীত: অভিবাসনের পথ জিম্মি অভিবাসননীতির কাছে, আর দূরের কাজ জিম্মি ক্লায়েন্টের বাজেটের কাছে, এখন স্বয়ংক্রিয়তার কাছেও।
লক্ষ করার মতো বিষয়, ভারতীয় শিল্পের আত্মপক্ষ—‘আমরা এখন স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দিই’—আসলে সেই মডেলই, যা বাংলাদেশ এমনিতেই চালায়। ভিসা স্থগিতের বিরুদ্ধে সুরক্ষা হলো ভিসার দরকারই না পড়া। এটি সত্যিকারের একটি কাঠামোগত সুবিধা, আর এমন এক সপ্তাহে কথাটি স্পষ্ট করে বলা দরকার, যখন প্রতিটি মার্কিন বিধিনিষেধকে ক্ষতি হিসেবে পড়াই বেশি স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় স্তরের একটি প্রভাবও নজরে রাখার মতো। মার্কিন পথটি সংকুচিত হলে যে প্রকৌশলীরা ওই পথে যেতেন, তাঁরা উবে যান না—তাঁরা থেকে যান, আর ত্রিশ বছর ধরে ভারত যে মেধা রপ্তানি করে আসছে, তা দেশেই জমতে শুরু করে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ঘোষিত আশাও এটিই, আর কথাটি যুক্তিসংগত। একই সঙ্গে এতে ভারত আরও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে ঠিক সেই দূরের ও আউটসোর্স করা কাজে, যা বাংলাদেশ বিক্রি করে।
অর্থাৎ খবরটিকে কেবল ‘ভারতের ক্ষতি’ হিসেবে পড়লে ভুল হবে। স্বল্প মেয়াদে এটি ব্যক্তিদের জন্য ধাক্কা; দীর্ঘ মেয়াদে এটি প্রতিবেশী একটি শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘনত্ব বাড়ায়—আর সেই বাজারের সঙ্গেই বাংলাদেশকে দর কষতে হয়।
সম্পর্কিত: এশিয়ার এআই নিয়ম লিখতে বসা ২৭ দেশ।




