প্রযুক্তি

ঢাকায় শুরু বিপিও সামিট ২০২৫, সরকারের প্রযুক্তি উপদেষ্টার সতর্কবার্তা: এআই নিন, নয়তো ব্যবসা হারান

সেনাপ্রাঙ্গণে ৩০টি দেশি-বিদেশি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান, চাকরির মেলা, ড্রোন ও রোবটের এক্সপেরিয়েন্স জোন, দুই দিনের সেমিনার। প্রতিপাদ্য ‘বিপিও ২.০: রেভল্যুশন টু ইনোভেশন’, আর উদ্বোধনী বক্তৃতা ঘুরপাক খেল একটি প্রশ্নে: কলদাতার উত্তর যখন যন্ত্র দেয়, কল-সেন্টার শিল্পের তখন কী হয়।

ঢাকায় শুরু বিপিও সামিট ২০২৫, সরকারের প্রযুক্তি উপদেষ্টার সতর্কবার্তা: এআই নিন, নয়তো ব্যবসা হারান

হালনাগাদ, অক্টোবর ২০২৬ — এই মঞ্চ থেকে দেওয়া সতর্কবার্তাটি — এআই নিন, নয়তো ব্যবসা হারাবেন — এখন যে শিল্পকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছিল তার বিপরীতে যাচাই করা যায়। ফলটি তর্কের কোনো পক্ষেরই প্রত্যাশামতো নয়: বিশ্বের সবচেয়ে বড় আউটসোর্সিং বাজারে এআই গ্রহণ বেড়েছে, আর সঙ্গে কর্মসংস্থানও বেড়েছে। সংখ্যাগুলো কী দেখায় আর কী আড়াল করে — মূল লেখার পরেই।

দেশের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং শিল্প শনিবার জড়ো হলো ঢাকার সেনাপ্রাঙ্গণে বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৫-এ—বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্টাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সঙ্গে আইসিটি বিভাগ ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের আয়োজনে দুই দিনের অনুষ্ঠান। উদ্বোধন করলেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। প্রতিপাদ্য ‘বিপিও ২.০: রেভল্যুশন টু ইনোভেশন’ হলের সবাই যা ভাবছিলেন, তার ভদ্র নামকরণ।

এআইয়ের প্রশ্ন, সরাসরি

প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তা নরম করলেন না। কোভিডের পর প্রযুক্তি খাত মৌলিকভাবে বদলেছে, তিনি বললেন, আর ‘এখনকার নয়া বাস্তবতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিপিওসহ প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এআই গ্রহণ না করলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।’ এটি হুমকি নয়, সতর্কবার্তা: যে শিল্প টেলিফোনের উত্তর দেওয়া মানুষের কণ্ঠ বেচে, এআই এজেন্ট ঠিক সেই শিল্পের জায়গা নিতেই গড়া, আর বাংলাদেশের কম খরচের, ইংরেজি-সক্ষম জনবলের প্রস্তাব যন্ত্র সস্তা হওয়া প্রতিটি বছরে কম দামি। তাঁর উত্তর দক্ষ মানবসম্পদ ও কার্যকর নীতি—শিল্পকে মূল্য শৃঙ্খলে ওপরে উঠতে হবে, যে কাজে এখনো মানুষ লাগে সেদিকে।

সরকার যা প্রতিশ্রুতি দিল

আদিলুর রহমান খান বিপিওকে তুলে ধরলেন কৃষি ও পোশাকে গড়া অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পে সরে যাওয়ার অংশ হিসেবে, আর রাষ্ট্রের অবদান হিসেবে দেখালেন স্মার্ট নগর পরিকল্পনা ও আইটি পার্ক নির্মাণ। বাক্কো সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম বললেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ও কর্মসংস্থান গড়ছে, আর প্রযুক্তির বদলের গতি নিজেই সুযোগ তৈরি করছে। আইসিটি বিভাগের মহাপরিচালক মো. আবু সাঈদ ও বাক্কোর সাধারণ সম্পাদক ফয়সল আলিমও বক্তব্য দেন; সভাপতিত্ব করেন আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।

মেঝেতে

৩০টি দেশি ও আন্তর্জাতিক আইটি ও বিপিও প্রতিষ্ঠান প্রদর্শনীতে, সঙ্গে বিদেশি ক্রেতা ও বিশ্লেষকদের নিয়ে সেমিনার ও কর্মশালা। এক্সপেরিয়েন্স জোনে অগমেন্টেড ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ড্রোন, একটি সাবমেরিনের মডেল ও রোবট, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের গড়া। সবচেয়ে ব্যবহারিক কোণ চাকরির মেলা, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণ আবেদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি জীবনবৃত্তান্ত নিল—একটি স্মারক যে এআই নিয়ে সেমিনার যা-ই বলুক, শিল্পটি এখনো মানুষ নিয়োগ করে, আর ঢাকার একটি সামিট সেই অল্প কয়েকটি জায়গার একটি, যেখানে রাজধানীর বাইরের স্নাতক এক বিকেলে দশটি প্রতিষ্ঠানের হাতে জীবনবৃত্তান্ত তুলে দিতে পারেন। কৌশলগত অংশীদার বিটিআরসি; সহযোগিতায় বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম ও টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশ। সামিট চলবে রোববার পর্যন্ত।

চাকরির আসলে কী হলো

সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আসে ফিলিপাইন থেকে — বিশ্বের বৃহত্তম কনটাক্ট সেন্টার বাজার, আর বাংলাদেশের শিল্পকে যার সঙ্গেই মাপা হয়। ২০২৫ সাল জুড়ে খাতটিতে এআই গ্রহণ দ্রুততর হওয়ার সময়েই ফিলিপাইনের কনটাক্ট সেন্টার ও বিজনেস প্রসেস খাতে কর্মসংস্থান ৬০ হাজারের বেশি বেড়ে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়, আগের বছরের প্রায় ১৬ লাখ ২০ হাজার থেকে; আর শিল্পের প্রক্ষেপণ বলছে ২০২৬ সালেও বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

এটি নিয়ে একটু থামা দরকার, কারণ দুই দিকের মঞ্চ থেকেই বলা গল্পের সরলতম সংস্করণটিকে এটি নাকচ করে। শিল্পটি ভেঙে পড়েনি। আবার স্থবিরও থাকেনি।

মোট সংখ্যাটি যা আড়াল করে

যে প্রযুক্তি জনবল প্রতিস্থাপন করে, তা গ্রহণ করার সময়েই জনবল বাড়তে থাকার মানে হলো নিচের গঠনটি বদলে গেছে — আর আসল ফলটি সেখানেই।

যে কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়েছে, সবাই যেটির কথাই বলেছিল: স্ক্রিপ্ট ধরে চলা, একটিমাত্র ফলাফলের, বিপুল পরিমাণের যোগাযোগ। অর্ডার কোথায় আছে জানা, সময় নেওয়া, ব্যালান্স জিজ্ঞাসা, পাসওয়ার্ড রিসেট। প্রকাশিত শিল্প-পরিসংখ্যান বলছে, রুটিন জিজ্ঞাসার ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামলানো হচ্ছে, আর তা মিটছে কয়েক সেকেন্ডে — যেখানে মানুষের আলাপে লাগে কয়েক মিনিট। এটি কাজের প্রকৃত প্রতিস্থাপন, সহায়তা নয়।

যা বেড়েছে তা হলো স্বয়ংক্রিয় পথটি যা যা হাতবদল করে দেয়: ব্যতিক্রম, রাগান্বিত গ্রাহক, যে ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি ইতিমধ্যে একবার ব্যর্থ হয়েছে, যে নিয়ন্ত্রিত আলাপ মডেলের হাতে ছাড়া যায় না — আর মডেলগুলোর নিজেরই তৈরি করা নতুন শ্রেণির কাজ: অ্যানোটেশন, মূল্যায়ন, প্রম্পট ও কর্মপ্রবাহের নকশা, যন্ত্রের উৎপাদনের মান পরীক্ষা। শিল্প-গবেষণা বলছে, কেবল ফিলিপাইনের খাতেই পাঁচ বছরে অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণ ও ডেটা কিউরেশনে প্রায় ১ লাখ নতুন পদ তৈরি হতে পারে।

কাজেই মোট কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি সত্যি, আর তা স্বস্তির খবর নয়। এটি বর্ণনা করে এমন একটি খাতকে, যা তার প্রবেশস্তরকে বদলে ফেলছে মধ্যস্তর দিয়ে — আর সংকুচিত হওয়ার চেয়েও এই রূপান্তর কঠিন, কারণ যে চাকরিগুলো হারিয়ে গেল সেগুলো দিয়েই মানুষ শুরু করত।

বাস্তুচ্যুতির সংখ্যাগুলো, আর সেগুলো পড়ার নিয়ম

বৃদ্ধির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে প্রক্ষেপণ, আর দুটিই একসঙ্গে সত্যি হতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় আউটসোর্সিং কেন্দ্রগুলোতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পদ ২০৩০ সালের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় হতে পারে; ভারত ও ফিলিপাইন মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ কর্মী বিঘ্নের মুখে পড়তে পারেন, আর সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে প্রায় ১০ লাখ আউটসোর্সিং চাকরি।

এগুলো কর্মসংস্থান ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস নয়। এগুলো হিসাব করে, বর্তমান কাজের মিশ্রণের কতটা যন্ত্র করতে পারে — যা ভিন্ন একটি পরিমাণ: কোনো পদ ৩০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়যোগ্য হয়েও টিকে থাকতে পারে, কেবল দিনটি ভিন্ন হয়ে। সৎ পাঠটি হলো, ঝুঁকি সমানভাবে ছড়ানো নয়, বরং জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী ঘনীভূত — আর যে শিল্পের বিক্রির কথা প্রতি আসনে কম খরচ, তাকে লড়তে হচ্ছে এমন কিছুর সঙ্গে যার প্রতি মিথস্ক্রিয়ার খরচ প্রতি বছর কমে। দামে এই দৌড় জেতা যায় না।

মঞ্চ থেকে দেওয়া পরামর্শের কী দাঁড়াল

সম্মেলনে উত্তর দেওয়া হয়েছিল “মূল্য শৃঙ্খলে ওপরে উঠুন”, আর প্রমাণ গন্তব্য হিসেবে একে সমর্থন করে — তবে পথ নিয়ে কিছু বলে না, আর গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সেটিই।

ওপরে ওঠা মানে বর্তমান কর্মীদের আরও কড়া প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়। যে কাজ টিকে থাকে তাতে লাগে বিচারবোধ, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, লিখিত যোগাযোগের দক্ষতা এবং স্ক্রিপ্ট অনুসরণের বদলে একটি ব্যবস্থাকে তদারক করার সক্ষমতা — অর্থাৎ ভিন্ন ধরনের নিয়োগ, দীর্ঘতর প্রশিক্ষণ নয়। আর প্রতি একক আয়ে এতে কম লোক লাগে, কাজেই যে নীতি শিল্পের মুনাফা বাঁচায় সেটিই তার জনবলবৃদ্ধি কমায়। এই দুটি কথা সাধারণত আলাদা করে বলা হয়, অথচ এ দুটি একই কথা।

পরামর্শটি দ্বিতীয় যে জিনিসটি এড়িয়ে যায়, তা হলো প্রবেশস্তরের সমস্যাটি কে শোষণ করবে। বহু স্নাতক আর অল্প আনুষ্ঠানিক চাকরির দেশে বিপিও শিল্পের মূল্য বরাবরই ছিল এই যে, এটি নিচের স্তরে বিপুল সংখ্যায় নিয়োগ দেয় এবং কাজের ভেতরেই প্রশিক্ষণ দেয়। নিচের স্তরটি স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে খাতটির আয় অটুট থেকেও তার সামাজিক ভূমিকা — রাজধানীর বাইরের কারও প্রথম আনুষ্ঠানিক চাকরি, বেতনসহ ও একটি সনদসহ — দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়, নীতির প্রশ্ন, আর মঞ্চে এ আলোচনা হয়নি।

পূর্বাভাসের বদলে যা লক্ষ করা দরকার

পরিমাপযোগ্য তিনটি জিনিস যেকোনো পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি বলবে: মোট জনবল বাড়ার সময়েও প্রবেশস্তরের নিয়োগের পরিমাণ টিকে আছে নাকি কমছে; কর্মীপ্রতি আয় বাড়ছে কি না, কারণ সংখ্যায় মূল্য শৃঙ্খলে ওপরে ওঠা দেখতে এ রকমই; আর চুক্তিগুলো প্রতি আসনের দাম থেকে প্রতি ফলাফলের দামে সরছে কি না, কারণ যে ক্রেতা ঘণ্টার বদলে সমাধানের দাম দিচ্ছেন, তিনি শ্রম কেনা বন্ধ করে ফলাফল কেনা শুরু করেছেন। তৃতীয়টিই শিল্পের গড়ন স্থায়ীভাবে বদলে দেবে, আর এটি নিয়েই সবচেয়ে কম লেখা হয়।

সূত্র: IBPAP, BACCO, Philippine contact centre employment data, industry analyst projections, Tech BD archive (June 2025), updated October 2026

লিখেছেন

Miraj S

টেক বিডিতে প্রযুক্তির ব্যবসা নিয়ে লেখেন মিরাজ এস — বাংলাদেশের প্রযুক্তি অর্থনীতি, ই-কমার্স, টেলিকম, যন্ত্রাংশের দাম আর সেগুলোর পেছনের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ঢাকার বাজারদরের নিয়মিত হিসাব তিনিই রাখেন—অর্থাৎ ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গেই তা তাঁকে জানানো হয়।