কক্ষপথে ভেঙে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পুরোনো গুপ্তচর স্যাটেলাইট; একই উচ্চতায় থাকা যোগাযোগ ও ইন্টারনেট স্যাটেলাইটগুলো নিয়ে এতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যা জানা গেছে
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ফারাহ থ্রি কোড নামে পরিচিত আর ১৯৮৮ সালে পাঠানো স্যাটেলাইট ইউএসএ ৩২ মহাকাশে ৩৮ বছর কাটিয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে হঠাৎ টুকরা টুকরা হয়ে যায়।
কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। মহাকাশবিজ্ঞানী টনি ফিলিপসের পরিচালনাধীন স্পেসওয়েদার ডট কম বলছে, যানটির ভেতরের কোনো চাপযুক্ত ট্যাংক বা ব্যাটারি ফেটে যাওয়ায় এটি ঘটতে পারে। স্যাটেলাইটটি ব্যস্ত কক্ষপথে থাকায় মহাকাশ বর্জ্য বা উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিপস জানিয়েছেন, ওই উচ্চতার কাছাকাছি আইরিস নেক্সট কনস্টেলেশনের সক্রিয় যানসহ দুই শতাধিক স্যাটেলাইট চলছে। সিএনএন জানিয়েছে, স্যাটেলাইটটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যান্টিস্যাটেলাইট অস্ত্রে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো প্রমাণ নেই; ২০২১ সালে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি পুরোনো সোভিয়েত স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশে এর মানে কী
বঙ্গবন্ধু-১ আছে ভূস্থির কক্ষপথে, প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে; নিম্ন কক্ষপথের ভাঙনে তার ঝুঁকি নেই। এটিই সরল উত্তর, আর আশ্বাসটুকু এখানেই শেষ।
মহাকাশ থেকে বাংলাদেশ আর যা যা পায়, তার প্রায় সবই আছে ঠিক ওই ভিড় করা স্তরে—যেখানে স্যাটেলাইটটি ভেঙেছে। হাওরের বন্যা-মানচিত্র আর বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত ছবি আসে নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট থেকে। কৃষি ও বাঁধ পর্যবেক্ষণের ভূ-পর্যবেক্ষণ উপাত্তও। স্টারলিংকও, যা এ বছর এ দেশে চালু হয়েছে আর যার যানগুলো থাকে ঠিক ওই অঞ্চলেই।
একটি ভাঙন নিজের বর্জ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় কারণ হিসাবটি জমতে থাকে। ওই উচ্চতায় টুকরা দ্রুত পড়ে না; তারা একটি বলয়ে ছড়িয়ে যায়, আর প্রতিটি টুকরা হয়ে ওঠে পরের ভাঙন ঘটাতে পারে এমন একটি বস্তু। এ শিকলের একটি নাম আছে, কেসলার সিনড্রোম—আর তা ধীর ও কার্যত অপরিবর্তনীয়।
কিছু না পাঠিয়েও মহাকাশ-সেবা ব্যবহার করা দেশের জন্য কোনো কৌশলগত প্রতিকার নেই। একটি কূটনৈতিক প্রতিকার আছে, আর তা জৌলুশহীন: মেয়াদ শেষে যান সরানো আর বর্জ্যের দায় নিয়ে নিয়ম লেখা হয় মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটির মতো জায়গায়, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভোট আছে—আর তা তারা প্রায় কখনোই ব্যবহার করে না। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট সক্ষমতা, ছবি আর সংযোগ কেনে; ১৯৮৮ সালের একটি যানকে ভেতরে চাপযুক্ত ট্যাংক রেখেই ওপরে থাকতে দেওয়া হলো কেন—এতে তার সরাসরি স্বার্থ আছে।
সতর্কবার্তাটি সোজাভাবে নেওয়াই ভালো। এখানে কিছু ভূপাতিত করা হয়নি। দেশের বেশির ভাগ মানুষের চেয়ে বয়সে বড় একটি স্যাটেলাইট নিজেই ভেঙে গেছে।
কক্ষপথের আবর্জনা কীভাবে জমে
একটি পুরোনো স্যাটেলাইট ভেঙে যাওয়ার খবর আলাদা ঘটনা মনে হয়, কিন্তু সমস্যাটি যোগফলের।
নিচু কক্ষপথে বস্তুর গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৮ হাজার কিলোমিটার। ওই গতিতে এক সেন্টিমিটারের টুকরোও কার্যকর স্যাটেলাইট অচল করে দিতে পারে, আর সংঘর্ষ হলে একটি ভাঙা বস্তু থেকে তৈরি হয় আরও অনেক টুকরো—যার প্রতিটি পরের সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ায়। এই শিকল-প্রতিক্রিয়ার ধারণাটির নাম কেসলার সিনড্রোম, আর এর ভয়টি তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের নয়; ভয়টি হলো নির্দিষ্ট উচ্চতাগুলো ধীরে ধীরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাওয়া।
পুরোনো যন্ত্রগুলো এ জায়গায় বিশেষ সমস্যা, কারণ ১৯৮০-এর দশকে উৎক্ষেপণ করা স্যাটেলাইটে কাজ শেষে কক্ষপথ ছেড়ে নেমে আসার কোনো ব্যবস্থা রাখা হতো না। এখনকার নিয়মে সেটি রাখতে হয়, কিন্তু নিয়মটি অতীতে ফিরে যায় না—ফলে পরের কয়েক দশক ধরে এ ধরনের খবর আসতেই থাকবে।
কে এটি নজরে রাখে
কক্ষপথে কী ঘটছে তা জানার কাজটি কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতেই সীমিত, আর এটিই তথ্য পাওয়ার গতি ঠিক করে।
বড় অংশটি করে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বাহিনী, যারা রাডার ও দূরবীক্ষণের একটি নেটওয়ার্ক দিয়ে দশ সেন্টিমিটারের চেয়ে বড় বস্তুগুলোর তালিকা রাখে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ও কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও একই কাজ করে। তালিকার বাইরে থাকে ছোট টুকরোগুলো—যেগুলো সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি এবং স্যাটেলাইটের জন্য সমান বিপজ্জনক।
এর ফল হলো, কোনো ভাঙনের পর প্রথম কয়েক দিনের হিসাব সাধারণত অসম্পূর্ণ থাকে। টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে, আর প্রতিটি আলাদা করে শনাক্ত করতে আরও বেশি। তাই এ ধরনের খবরে প্রথম দিনের সংখ্যাটি প্রায় সব সময়ই পরে বাড়ে—কম অনুমান করা হয়েছিল বলে নয়, বরং গোনা তখনো শেষ হয়নি বলে।




