মহাকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য পৃথিবীতে নামানো আর তা প্রক্রিয়াজাত করা এ ক্ষেত্রের কঠিন সমস্যাগুলোর একটি। এর সমাধানে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই কক্ষপথে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিতে চেয়েছেন। এবার একটি দল প্রথমবারের মতো মহাকাশে কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালিয়েছে।
কঠিন কেন
কোয়ান্টাম কম্পিউটার অত্যন্ত সংবেদনশীল: তাপ, কম্পন ও তড়িৎ-চৌম্বকীয় হস্তক্ষেপ এর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা গবেষণাগারের বাইরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করাই কঠিন। আর মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে তা করা আলাদা ব্যাপার—যা করে দেখিয়েছেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী ফিলিপ ওয়ালথারের নেতৃত্বে একটি দল।
তাঁরা এমন প্রসেসর বানিয়েছেন, যা আলোর কণা বা ফোটন ব্যবহার করে কোয়ান্টাম তথ্য বহন করে; ক্ষুদ্র একটি কাচের চিপের ভেতরে আলোকপথের মাধ্যমে তৈরি হয় ফোটন-জোড়া।
কক্ষপথে যা ঘটল
কম্পিউটারটি গত বছরের ২৩ জুন ফ্যালকন ৯ রকেটে করে পাঠানো হয় প্রায় ৫১০ কিলোমিটার উচ্চতার নিম্ন ভূকক্ষপথে। শুরুতেই সূর্যের আলো ও বিকিরণে ফোটন ডিটেক্টরগুলো বড় চাপে পড়ে; তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ছায়ায় থাকার সময়টুকু কাজে লাগিয়ে দিনে প্রায় ৩০ মিনিট সংবেদনশীল পরিমাপ সেরেছেন। ভ্যান অ্যালেন বেল্টের শক্তিশালী প্রোটন ও ইলেকট্রন ঠেকাতে যন্ত্রটির চারপাশে দেওয়া হয়েছিল পুরু অ্যালুমিনিয়ামের আবরণ। দীর্ঘ ব্যবহারে ডিটেক্টরের সংবেদনশীলতা কিছুটা কমলে ভোল্টেজ সমন্বয় করে তা ঠিক করা হয়।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা মহাকাশে ঘটাতে পেরেছেন কোয়ান্টাম ব্যতিচার—যা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল ভিত্তি। ক্রিস্টালের তাপমাত্রা বদলে ফোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য মিলিয়ে দেওয়ায় প্রায় ৩২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কণাগুলোর আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে আর তৈরি হয় হং-কাউ-ম্যান্ডেল ডিপ।
গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে স্যাটেলাইটগুলো কক্ষপথেই তথ্য সংকুচিত ও বিশ্লেষণ করতে পারবে—এতে গ্রাউন্ড স্টেশনের চাপ কমবে আর বিশ্বব্যাপী কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্কের পথ খুলবে।
বাংলাদেশে এর মানে কী
বাংলাদেশ কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট পাঠাবে না, আর তা আড়াল করে এ গল্পের কোনো সৎ সংস্করণ হয় না। এর ভেতরে দুটি জিনিস আছে, যা এখানে পৌঁছায়।
প্রথমটি তথ্য নামানোর সমস্যা, যা বাংলাদেশেরও নিজের মতো করে আছে। দেশটি বঙ্গবন্ধু-১ পরিচালনা করে আর বন্যার মানচিত্র, ফসল পর্যবেক্ষণ ও উপকূলীয় ভাঙন দেখতে বিপুল ভূ-পর্যবেক্ষণ চিত্র কেনে। এর প্রতিটি ব্যবহারই আটকে থাকে কতটা তথ্য নামানো যায় আর নামার পর তা কত দ্রুত প্রক্রিয়াজাত হয় তাতে। কক্ষপথেই প্রক্রিয়াজাত করা—কোয়ান্টাম হোক বা প্রচলিত পদ্ধতিতে—বদলে দেয় একটি ছোট দেশ স্যাটেলাইটের কাছে কী চাইতে পারে তার হিসাব।
দ্বিতীয়টি সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভালো প্রকৌশল দেখতে কেমন, তা নিয়ে; আর পদার্থবিদ্যার চেয়ে এ দেশের শিক্ষার্থীদের এতেই বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা। দলটি সূর্যকে থামাতে পারেনি, তাই কাজ করেছে ছায়ায়। বিকিরণ ঠেকাতে পারেনি, তাই যন্ত্রটি মুড়ে দিয়েছে অ্যালুমিনিয়ামে। ডিটেক্টরের সংবেদনশীলতা কমলে কিছু বদলানোর বদলে ভোল্টেজ সমন্বয় করেছে। দিনে ৩০ মিনিটকে ব্যর্থতা না ভেবে কাজের সীমা হিসেবেই মেনে নিয়েছে।
সীমিত যন্ত্র-বাজেটের দেশে গবেষণায় ঠিক এই শৃঙ্খলাটিই দরকার—আর পরিস্থিতি নিখুঁত নয় বলে কাজ ছেড়ে দেওয়ার প্রবৃত্তির এটি উল্টো।
কোয়ান্টাম যন্ত্র এখনই কী পারে, সেই কাছের প্রশ্নটি আছে দুটি জ্যামিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করা কম্পিউটারের খবরে।




