টুইটারের (বর্তমানে এক্স) সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী জ্যাক ডরসির মালিকানাধীন ব্লক ইনকরপোরেশন ডেসা নামের একটি স্পিচ মডেল তৈরি করেছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে।
এক্সে ডরসি লিখেছেন, যোগাযোগের সবচেয়ে স্বাভাবিক মাধ্যম কণ্ঠস্বর, আর ডেসা একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিমুখী কথোপকথনভিত্তিক স্পিচ মডেল, যা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার জন্যই তৈরি। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য আকার: ল্যাপটপেও চালানো যায়।
আলাদা কী করে
ব্লক যে আচরণগুলো দেখাচ্ছে, সেগুলো না থাকলেই কণ্ঠসহকারীদের যন্ত্রবৎ মনে হয়। ডেসা একই সময়ে শোনে ও বলে—ব্যবহারকারীর কণ্ঠস্বর নিয়ে সরাসরি নিজ কণ্ঠে উত্তর দেয়, কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করে না। ব্লকের বক্তব্য, এটি বাস্তব সময়ের চেয়ে দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, তাই শোনা আর উত্তর দেওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব কম।
ডেসার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নমুনা কথোপকথনে দেখা যায়, কখন বলতে হবে, কী বলতে হবে এবং কীভাবে বলতে হবে—মডেলটি নিজেই তা ঠিক করছে। মজার প্রসঙ্গ এলে কথার মাঝখানেই স্বাভাবিকভাবে হেসে ওঠে, পরিস্থিতি অনুযায়ী বিস্ময় প্রকাশের শব্দ ব্যবহার করে, সহানুভূতিও জানায়। ব্যবহারকারী কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলে আলোচনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখে, নতুন করে শুরু করে না।
আসল খবর প্রশিক্ষণের দাবিটি
ডেসাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে মানুষের পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার অডিও শোনানোর মাধ্যমে। কোনো লিখিত তথ্য ব্যবহার করা হয়নি, আগে থেকে প্রশিক্ষিত কোনো মডেলের ওপরেও এটি বানানো হয়নি। ব্লকের দাবি, কেবল মানুষের কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রশিক্ষিত এটিই বিশ্বের প্রথম এআই মডেল।

এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে একটু ব্যাখ্যা লাগে। বেশির ভাগ কণ্ঠসহকারী আসলে একটি রিলে: কথা রূপান্তরিত হয় লেখায়, একটি টেক্সট মডেল উত্তর ঠিক করে, তারপর উত্তরটি আবার কথায় রূপান্তরিত হয়। কণ্ঠস্বরে যা আছে কিন্তু তার শব্দে নেই—ইতস্তত ভাব, বিরক্তি, সন্দেহের চড়া সুর, দুঃসংবাদের আগের নিশ্বাস—সবই প্রথম ধাপে ফেলে দেওয়া হয়, আর শেষ ধাপে বানিয়ে নেওয়া হয়।
ব্লকের যুক্তি, বিশ্বের শক্তিশালী মডেলগুলো ব্যবহারকারীর অনুভূতি শুনে বুঝতে পারে না, তাই তাদের সঙ্গে কথা স্বচ্ছন্দে এগোয় না; এমনকি অনুভূতি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার কারণে কখনো ভুল প্রতিক্রিয়াও দেয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অডিওতে প্রশিক্ষণ দিলে এই তথ্যটুকু প্রক্রিয়ার ভেতরেই থাকে।
সতর্কতা হলো, ‘কেবল মানুষের কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রশিক্ষিত প্রথম মডেল’—এই দাবি প্রতিষ্ঠানের নিজের, নিজের পণ্য সম্পর্কে, উন্মোচনের মুহূর্তে করা। দাবিটি বিশ্বাসযোগ্য, তবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নয়। ডেসা এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, নির্দিষ্টসংখ্যক আগ্রহী ব্যক্তিই ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে নমুনাটিই একমাত্র প্রকাশ্য প্রমাণ—আর নমুনা বেছে দেন যাঁরা জিনিসটি বানিয়েছেন, তাঁরাই।
ল্যাপটপে চলার কথাটিই লক্ষ্য রাখার মতো
আকারের দাবিটি টিকে গেলে এখানে কথোপকথনের ঝকঝকে ভাবের চেয়ে সেটিই বেশি জরুরি। স্থানীয়ভাবে চলা একটি স্পিচ মডেল কথোপকথনের বিষয়বস্তু সার্ভারে পাঠায় না, নির্ভরযোগ্য সংযোগ দরকার হয় না, মিনিটের হিসাবে বিলও করে না। রোগীর ইতিহাস নেওয়া কোনো ক্লিনিক, কল সেন্টার কিংবা অভিযোগ লিখে রাখা সরকারি দপ্তরের জন্য এই তিনটি গুণই পরীক্ষামূলক প্রকল্প আর আসল ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
এর সার্ভারভিত্তিক সংস্করণ আমরা দেখেছি: ইংল্যান্ডের একটি অ্যাম্বুলেন্স সেবা আইপ্যাডের মাধ্যমে এআইকে রোগীর কথা শুনতে দিচ্ছে এবং নোট লেখাচ্ছে। সেই পরীক্ষায় গোপনীয়তার প্রশ্নগুলো মূলত এই প্রশ্নই—অডিওটা কোথায় যাচ্ছে।
যে প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি
কোন কোন ভাষা। কথোপকথনের অডিওতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষিত মডেল সেই অডিওতে যেসব উচ্চারণ ও ভাষা আছে, তা-ই পায়; ব্লকের ঘোষণায় বাংলা সেগুলোর মধ্যে আছে—এমন কিছু বলা নেই। টেক্সট মডেলের ক্ষেত্রে ঘাটতিটা অন্তত মাপা যায়; লেখা ছাড়া প্রশিক্ষিত স্পিচ মডেলে বাইরে থেকে বাংলার সক্ষমতা পরীক্ষা করার সহজ উপায় এখনো নেই।
এটি নতুন নয়, পুরোনো সমস্যা। বাংলাকে এখনো স্বল্প-সম্পদের ভাষা হিসেবেই গণ্য করা হয়, আর কারণটি সহজ—ব্যবহারযোগ্য তথ্য কত কম আছে। তত্ত্বগতভাবে কণ্ঠস্বর-প্রথম স্থাপত্য এখানে সহায়ক হতে পারে: পরিচ্ছন্নভাবে প্রতিলিপি করা লেখা বাংলা যেখানে কম, কথ্য বাংলা সেখানেও প্রচুর। কেউ তাতে প্রশিক্ষণ দেবে কি না, সেটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়—বাণিজ্যিক।
প্রতিবেদনটির জন্য প্রথম আলো ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।




