শনি গ্রহের বরফাবৃত উপগ্রহ এনসেলাডাসের ভূগর্ভস্থ মহাসাগরে অতি ক্ষুদ্র জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন জার্মানির ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনের বিজ্ঞানীরা। এই ফল মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং ভিনগ্রহে প্রাণের অনুসন্ধানকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরীক্ষাটি হলো কীভাবে
মহাকাশযানের অপেক্ষা না করে গবেষক দল গবেষণাগারেই বানিয়ে ফেলেন এনসেলাডাসের ভূগর্ভস্থ মহাসাগরের কৃত্রিম পরিবেশ। তাতে রাখা হয় গভীর সমুদ্রের তলদেশের হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে পাওয়া বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া।
ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই বেঁচে থাকে, বিপাকক্রিয়া চালায় হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে। অত্যন্ত কঠিন ওই কৃত্রিম পরিবেশেও তারা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালোভাবে টিকে থাকে।
বিজ্ঞানী নোজাইর খাওয়াজা জানান, ফলাফলটি অবাক করার মতো। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসের এনসেলাডাসের উপরিভাগের তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ২০১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে—তবু এর পাথুরে কেন্দ্রের ভূতাপীয় প্রক্রিয়ার কারণে বরফের নিচে রয়ে গেছে বিশাল তরল জলের মহাসাগর।
এনসেলাডাসের নাম বারবার আসে কেন
উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে ফাটল আছে, আর সেই ফাটল দিয়ে ভূগর্ভস্থ মহাসাগরের পানি ও বরফকণা শত শত মাইল উঁচুতে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে। এ কারণেই এনসেলাডাস অস্বাভাবিকভাবে পরীক্ষাযোগ্য: নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান ওই ধারার মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে রাসায়নিক উপাদান সরাসরি সংগ্রহ করেছিল, কোথাও না নেমেই।
ফ্রাংক পোস্টবার্গ যে কথাটি বলেছেন, তাতেই পুরো ফলাফলের ভিত্তি: প্রাচীন পৃথিবীতেও অক্সিজেন ছিল না, আর এই জীবাণুগুলো ঠিক সেই পরিবেশেই বিবর্তিত হয়েছে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে অদ্ভুত কিছু করতে বলা হচ্ছে না—বলা হচ্ছে সেটিই করতে, পৃথিবীর প্রাণ একবার যা করেছিল।
সতর্ক ভাষাটিও জরুরি। এনসেলাডাসে আসলেই প্রাণ আছে কি না, তা এখনো জানা নেই। এ গবেষণা যা দেখায় তা হলো—সেখানে প্রাণের টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ আছে।
বাংলাদেশে এর মানে কী
এনসেলাডাসে বাংলাদেশের কোনো অভিযান নেই, হবেও না। এখান থেকে নেওয়ার মতো জিনিস পদ্ধতিটি—কারণ মহাকাশবিজ্ঞানের সস্তা অংশ এটিই, আর উৎক্ষেপণ কর্মসূচি না থাকা দেশও এটি করতে পারে।
এই ফল কোনো মহাকাশযান থেকে আসেনি। এসেছে একটি গবেষণাগার, ভেবেচিন্তে বেছে নেওয়া একটি জীব আর অন্য কোনো জায়গার যত্নে বানানো অনুকরণ থেকে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কাজ—অণুজীববিজ্ঞান, চরমপন্থী জীবের চাষ, ভূরসায়ন—আর এর নানা রূপ করার মতো জীববিজ্ঞান বিভাগ বাংলাদেশে আছে। দেশের নিজের চরম পরিবেশগুলো কম পরীক্ষিত: সুন্দরবনের অক্সিজেনহীন পলি, আর্সেনিকবাহী ভূগর্ভস্থ স্তর, উপকূলের অতি লবণাক্ত মাটি। এসবে টিকে থাকা জীব আন্তর্জাতিকভাবেই কৌতূহলের, আর সেগুলো চিহ্নিত করতে টেলিস্কোপের ভগ্নাংশ খরচই যথেষ্ট।
এ দেশে বিজ্ঞান শেখানোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্যোতির্জীববিদ্যা এমন গুটিকয় শাখার একটি, যেখানে একটি শিশুর করা প্রশ্ন—ওখানে কি প্রাণ আছে—সরাসরি নিয়ে যায় সত্যিকারের গবেষণাগারের কাজে। এনসেলাডাসে হাইড্রোজেন আর কার্বন ডাই-অক্সাইড কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা যে শিক্ষার্থী বুঝেছে, সে বিপাকক্রিয়া বুঝেছে বেশির ভাগ পাঠ্যসূচির শেখানোর চেয়েও ভালোভাবে।




