প্রযুক্তি

তিন মাস বয়সের একটি দিনও মনে আছে ১৬ বছরের কিশোরটির, গবেষকেরা এবার কারণটি নিশ্চিত করলেন

অতি উন্নত আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি আছে জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের। কর্টেক্স সাময়িকীর নতুন গবেষণায় নথিভুক্ত হলো এক কিশোরের শৈশবের যাচাই করা স্মৃতি—আর মিলল, তার স্মৃতিশক্তি সামগ্রিকভাবে ভালো নয়, ফিরে পাওয়ার পথটাই আলাদা।

তিন মাস বয়সের একটি দিনও মনে আছে ১৬ বছরের কিশোরটির, গবেষকেরা এবার কারণটি নিশ্চিত করলেন

মানুষের স্মৃতিশক্তি ভঙ্গুর, সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষ অতীতের সাধারণ দিনগুলোও নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারেন—আর গবেষকেরা এবার সেই সক্ষমতা নথিভুক্ত করেছেন ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের মধ্যে।

কর্টেক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় তার পরিচয় গোপন রেখে তাকে বলা হয়েছে কেসিএল। গবেষকদের ভাষ্য, তার রয়েছে হাইপারথিমেশিয়া, যাকে বলা হয় অতি উন্নত আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি (এইচএসএএম)।

সে কী পারে

নিজের শৈশবের ঘটনাগুলো অস্বাভাবিক নিখুঁত ও স্পষ্টভাবে মনে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা আছে কেসিএলের—এর মধ্যে আছে মাত্র তিন মাস বয়সের ঘটনাও। তার বাবা-মা ওই প্রাথমিক স্মৃতিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, তিন বছর বয়স থেকে তার সচেতন স্মৃতি আরও জোরালো হয়েছে।

তাঁদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট গন্ধ, গান বা ছোট একটি বাক্যেই কেসিএলের মনে স্মৃতি আপনাআপনি ভেসে ওঠে।

ফ্রান্সের গ্রেনোবল আল্পস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টিয়ান বার্জিকোভস্কি ও তাঁর সহকর্মীরা এই অনিচ্ছাকৃত স্মৃতি ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সাধারণ মানুষের তুলনায় কেসিএলের অতীত স্মৃতি মনে করার ক্ষমতা অনেক বেশি। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা অন্য ধরনের চিন্তায় তার মানসিক সক্ষমতা স্বাভাবিক।

যে পর্যবেক্ষণটি আসল

এটি ঠিক কী, সে বিষয়ে গবেষকেরা সতর্ক। এটি সামগ্রিকভাবে উন্নত স্মৃতিশক্তি নয়। এটি মস্তিষ্কের তথ্য পুনরুদ্ধারের গতিশীলতার পরিবর্তন।

এই পার্থক্যটিই পুরো ফলাফল। এইচএসএএম থাকা মানুষ দৈনন্দিন তথ্য শেখেন অন্য সবার মতোই গতিতে—তাঁরা ভালো শিক্ষার্থী নন, তথ্যও দ্রুত রপ্ত করেন না। পার্থক্য কেবল আত্মজীবনীমূলক অভিজ্ঞতায় ফেরার পথে: আমাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সেই পথ ক্ষয়ে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে খোলা থাকে।

দূরবর্তী প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা চালিয়ে গবেষক দল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের হিসাবে, জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের এ ধরনের স্মৃতিশক্তি থাকে; আর এ ধরনের মানুষ বাকি সবকিছুতে সাধারণ মানুষের মতোই আচরণ করেন।

বাংলাদেশে এর মানে কী

দুটি কথা টেনে আনার মতো, আর কোনোটিই বিস্ময়-বালক নিয়ে নয়।

প্রথমটি ভুল বোঝা কত সহজ, তা নিয়ে। শৈশবের ঘটনা স্পষ্ট মনে রাখা কোনো শিশুকে এ দেশে হয় অসাধারণ মেধাবী, নয়তো বানিয়ে বলছে—এ দুয়ের একটি ভাবা হবে; দুটিই ভুল। এইচএসএএম স্মৃতি ফিরে পাওয়ার পার্থক্য, বুদ্ধিমত্তা নয়, আর এটি পড়াশোনার ফলাফলেরও পূর্বাভাস দেয় না। মুখস্থকে পুরস্কৃত করা আর তাকে বোঝার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা শিক্ষাসংস্কৃতিতে এটি জানা জরুরি। যে শিক্ষার্থী একটি অধ্যায় গড়গড় করে বলতে পারে না, সে মনে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে না; তার কাছে এমন এক ধরনের স্মরণ চাওয়া হচ্ছে, এই গবেষণা যাকে দেখাচ্ছে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সক্ষমতা হিসেবে।

দ্বিতীয়টি পদ্ধতি। এই শনাক্তকরণ নিশ্চিত হয়েছে দূর থেকে—গবেষক দল দূরবর্তী প্রক্রিয়াতেই কেসিএলের পরীক্ষা নিয়েছেন। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজিস্ট খুব কম, আর প্রায় সবাই ঢাকায়; ফলে বেশির ভাগ পরিবারের নাগালের বাইরে থাকে মূল্যায়ন। দূরবর্তী জ্ঞানীয় পরীক্ষা সেই বাধা এড়ানোর একটি পথ, আর এই গবেষণাই দেখাচ্ছে তাতে প্রকাশযোগ্য ফল মেলে। রোগনির্ণয়ের ব্যাপারেও একই যুক্তি খাটে, যা আমরা দেখেছিলাম এক পরিবারের বিরল রোগ শনাক্তের ঘটনায়, যেটি আশপাশের ব্যবস্থা ধরতে পারেনি।

সূত্র: প্রথম আলো

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।