২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের সরবরাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ—যা চৌদ্দ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল তৃতীয় প্রান্তিক।
কারণটি ক্রেতার চাহিদা নয়। কারণ মেমোরি চিপের সংকট, আর ওই চিপ দুর্লভ হওয়ার কারণ এআই অবকাঠামো নির্মাণে সেগুলো কেনা হচ্ছে।
আসলে যা ঘটছে
এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ায় মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। ফোনেও একই উপকরণ লাগে, আর এআই প্রকল্পগুলো সেগুলো এমন পরিমাণে কেনে যে হ্যান্ডসেটের উৎপাদনলাইন দরে পেরে ওঠে না। সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে, দাম বেড়েছে, ফলে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
নির্মাতারা সাড়া দিয়েছেন দুভাবে। কেউ দাম বাড়াচ্ছেন। কেউ ইচ্ছে করেই উৎপাদন ও সরবরাহ কমিয়েছেন—বিক্রির পরিমাণ না বাড়িয়ে মুনাফা ধরে রাখাকে বেছে নিয়ে। এ কারণেই সংকটটি কেবল দামি ফোন হিসেবে নয়, কম ফোন সরবরাহ হিসেবেও দেখা দিচ্ছে।
কে কোথায়
সবচেয়ে বেশি সরবরাহ করেছে স্যামসাং, বাজারের ২৩ শতাংশ দখলে রেখে—গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ সিরিজে ক্রেতাদের আগ্রহ আর মধ্যম দামের ফোনের যন্ত্রাংশের স্থিতিশীল সরবরাহ এতে ভূমিকা রেখেছে। তবু গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় তাদের সরবরাহ ৩ শতাংশ কমেছে।
অ্যাপলের দখলে ২২ শতাংশ। গত বছর আইফোন ১৭ সিরিজের সব মডেল একসঙ্গে এসেছিল; এ বছর আইফোন ১৮ সিরিজের সাধারণ মডেলটি আসেনি, ফলে নতুন সিরিজের প্রথম মাসে বিক্রেতাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা বদলে গেছে।
যে সংযোগটি বেশির ভাগ প্রতিবেদনে থাকবে না
এটি একই সংকট, শৃঙ্খলের ভিন্ন একটি বিন্দুতে মাপা।
ডিসেম্বরে আমরা লিখেছিলাম, সেপ্টেম্বরের পর ঢাকায় র্যামের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আর বিক্রেতারা বলছিলেন সমস্যা চাহিদা নয়, সরবরাহ। তাঁরা ঠিক এটিরই খুচরা প্রান্তের বর্ণনা দিচ্ছিলেন: এআই ডেটা সেন্টার মেমোরি শুষে নিচ্ছে, ডিডিআর৪ দুর্লভ হচ্ছে, ১৬ জিবির কিট পৌঁছাচ্ছে ১০ হাজার টাকায়।
কাউন্টারপয়েন্ট যোগ করছে পরিসরটি। ঢাকায় মেমোরির দ্বিগুণ দাম দেওয়া একজন পিসি-ক্রেতা আর চৌদ্দ বছরের সর্বনিম্ন বৈশ্বিক সরবরাহের সংখ্যা—দুটি একই ঘটনার দুই প্রান্ত, আর শৃঙ্খলটি গেছে একটি ডেটা সেন্টারের ক্রয়চুক্তি থেকে এলিফ্যান্ট রোডের দোকান পর্যন্ত।
বাংলাদেশে এর মানে কী
তিনটি ফল আসে, আর তৃতীয়টি নিয়েই পরিকল্পনা করা দরকার।
এখানে দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সঙ্গে নয়, পিছিয়ে বাড়বে। দেশে থাকা মজুত কেনা হয়েছে আগের দামে, তাই বৃদ্ধিটি আসবে ওই মজুত বদলানোর সময়—অর্থাৎ বাড়তি দাম এখনো সামনে, পেছনে নয়।
চাপটি সবচেয়ে বেশি পড়বে মধ্যম দামের ফোনে। ফ্ল্যাগশিপ বড় মুনাফার ভেতরে বাড়তি উপকরণ-খরচ শুষে নিতে পারে; ২০ হাজার টাকার হ্যান্ডসেট পারে না—আর বাংলাদেশের বেশির ভাগ ক্রেতা ওই ঘরেই কেনাকাটা করেন।
আর সংস্কার করা ফোনের বাজার বাড়বে, কারণ নতুন ফোন দামি হলে মানুষ পুরোনোটি বেশি দিন চালান। এটি এখনই দেখা যাচ্ছে, আর এতে একটি বাস্তব সমস্যা সামনে আসে: অনানুষ্ঠানিক পথে কেনা দ্বিতীয় হাতের হ্যান্ডসেটে আইএমইআই নিবন্ধনের প্রশ্ন থেকে যায়, যা আছে ধূসর বাজারের দামের ব্যবধান নিয়ে লেখাটিতে। যে সংকট ক্রেতাকে ব্যবহৃত ফোনের দিকে ঠেলে, সেটিই একই সঙ্গে তাঁকে ওই ঝুঁকির দিকে ঠেলে।
দেশীয় সংযোজনের ছবিটিও জটিল হয়। করের চাপ আর ধূসর বাজারের কারণে এখানে উৎপাদন এক বছরে ২৪ শতাংশ কমেছে; বৈশ্বিক যন্ত্রাংশ-সংকট একই দিকে কাজ করা দ্বিতীয় শক্তি—আর এটি এমন একটি, দেশীয় কোনো নীতি যার চাপ কমাতে পারে না।
কেনার সময় ঠিক করার হিসাব
সংকটের খবর পড়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে—এখন কিনব, নাকি অপেক্ষা করব?
মেমোরির দাম বাড়ার চক্র সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাসের। চাহিদা দেখে নির্মাতারা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ান, কিন্তু নতুন কারখানা চালু হতে সময় লাগে; সেই ক্ষমতা যখন আসে, দাম তখন নামতে শুরু করে। ২০১৮ সালের মেমোরি-সংকট এভাবেই মিটেছিল।
অর্থাৎ অপেক্ষা করলে সুফল আসতে পারে, তবে দ্রুত নয়। যাঁর ফোন এখনো চলছে, তাঁর জন্য অপেক্ষা যুক্তিসঙ্গত। যাঁর ফোন নষ্ট, তাঁর জন্য নয়—কারণ আগামী কয়েক মাসে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি, কমার নয়। আর যাঁরা এর মধ্যে কিনবেন, তাঁদের জন্য একটি কথা: এই সংকটে নির্মাতারা প্রথমে কাটছাঁট করেন র্যাম ও স্টোরেজে, দৃশ্যমান ফিচারে নয়। একই দামে আগের বছরের তুলনায় কম র্যাম পাওয়া অস্বাভাবিক হবে না, তাই স্পেসিফিকেশন মিলিয়ে দেখা এ বছর বেশি জরুরি।
সূত্র: কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ, প্রথম আলোর বরাতে।




