প্রযুক্তি বিশ্ব

এআইকে অবিশ্বাস করতে শেখানোই যাঁর পুরো কাজ, এমন শিক্ষক নিয়োগ দিল একটি স্কুল — আর পাঠ্যসূচিটিই আসল কৌতূহল

এআই সাক্ষরতার জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে মার্নস ক্যাসল হাই স্কুল। পাঠ্যসূচিতে আছে ডিপফেক, বানিয়ে বলা, যন্ত্রকে মানুষ ভাবা আর তোষামোদ—সরঞ্জাম চালানো নয়।

এআইকে অবিশ্বাস করতে শেখানোই যাঁর পুরো কাজ, এমন শিক্ষক নিয়োগ দিল একটি স্কুল — আর পাঠ্যসূচিটিই আসল কৌতূহল

কিছু কিশোর-কিশোরী এরই মধ্যে বাড়ির কাজ, পুনরালোচনা আর কোর্সওয়ার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ একেবারেই এড়িয়ে চলছে। ইস্ট রেনফ্রুশায়ারের মার্নস ক্যাসল হাই স্কুলে শিক্ষকেরা ঠিক করেছেন, বিষয়টি নেই ভান করা আর সম্ভব নয়।

ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যে এটিই প্রথম স্কুল, যারা এআই সাক্ষরতার জন্য আলাদা প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। পদটি পেয়েছেন জেমি লেকক, যিনি আগে ছিলেন জীববিজ্ঞানের প্রধান শিক্ষক। পদটির পেছনের বার্তা তাঁর ভাষায়: “এআই আপনাআপনি চলে যাবে, এই আশায় বসে থাকা যায় না।”

এতে নজর দেওয়ার কারণ এই নয় যে একটি স্কুল এআইকে বরণ করে নিয়েছে। কারণ হলো, কাজটি ঠিক উল্টো। লেককের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের শেখানো—কীভাবে একে প্রশ্ন করতে হয়, চ্যালেঞ্জ করতে হয় আর দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। সন্দেহই এখানে একটি বিষয়।

পাঠ্যসূচির চারটি জিনিস

শুরুর দিকের এক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের ও এআইয়ের বানানো ছবি মিলিয়ে দেখানো হয় এবং নকলগুলো চিনতে বলা হয়। কাজটি তাদের ধারণার চেয়ে কঠিন ছিল, আর লেকক বলছেন, এটি দিন দিন আরও কঠিন হচ্ছে।

বানিয়ে বলা। “হ্যালুসিনেশন” শব্দটি তাঁর পছন্দ নয়। “আমার মনে হয় হ্যালুসিনেশন আসলে খুব বাজে শব্দ, ব্যাপারটা হলো এটি জিনিস বানিয়ে ফেলে।” কমবয়সীদের ওপর এর আঘাত কেন সবচেয়ে বেশি, সে ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে ধারালো: তিনি যাকে ভিত্তিগত জ্ঞান বলছেন, তা না থাকলে শিক্ষার্থীর পক্ষে বানানো কথা আর তথ্যের পার্থক্য করার উপায় থাকে না। যিনি সবচেয়ে কম জানেন, সরঞ্জামটি তাঁর জন্যই সবচেয়ে কম নিরাপদ—আর বাড়ির কাজে সেটি তিনিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করবেন।

যন্ত্রকে মানুষ ভাবা। মানুষের মতো শোনায় বলেই চ্যাটবটকে বিশ্বস্ত বন্ধু বা বিশেষজ্ঞ ভেবে নেওয়া। “এর মানুষের মতো গুণ আছে, কিন্তু আসলে এটি নিছকই একটি যন্ত্র। আর বিশেষ করে কমবয়সীদের পক্ষে সব সময় এটি মাথায় রাখা সত্যিই কঠিন।”

তোষামোদ। “এটি তোষামোদকারী। সব সময় বলে আপনি অসাধারণ, আপনার ভাবনাটি দারুণ।” যে মডেল আপনার সঙ্গে একমত হয়, সে শুনতে আরামদায়ক আর আপনার ভাবনা যাচাইয়ের কাজে অকেজো; তিনি সতর্ক করছেন, এতে শিক্ষার্থীরা অতিনির্ভর হয়ে পড়ে।

পক্ষপাত। যে উপাদান দিয়ে মডেল তৈরি, তার নিয়মকানুনই মডেল বহন করে—আর সেই উপাদান সাধারণত ঘরের ভেতরের মানুষদের লেখা নয়, তাঁদের নিয়েও নয়।

পাঠগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন বয়স ও স্তর অনুযায়ী।

সরঞ্জাম শেখানোর কোর্সের চেয়ে এই তালিকা ভালো কেন

“স্কুলে এআই” ধরনের বেশির ভাগ কর্মসূচি শেখায় প্রম্পট লেখা। প্রম্পট লেখা এমন দক্ষতা, যার মেয়াদ মাসের হিসাবে মাপা যায়; আর ওপরের চারটির প্রতিটিই এসব ব্যবস্থার কাজ করার স্থায়ী ধর্ম, যা পরের মডেল এলেই মিলিয়ে যাবে না।

পাঠ্যসূচিতে একটি নীরব স্বীকারোক্তিও আছে। চারটির তিনটি—বানিয়ে বলা, তোষামোদ, পক্ষপাত—অপব্যবহার নয়। এগুলো সচল একটি ব্যবস্থার স্বাভাবিক আচরণ। এগুলোকে ত্রুটি না বলে ঝুঁকি হিসেবে পড়ানো এ বিষয়ে বেশির ভাগ করপোরেট প্রশিক্ষণের চেয়ে সৎ।

বাংলাদেশের যেটি দরকার, তা এর নকল নয়

বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষে একই সমস্যা আসছে আরও দ্রুত, কম শিক্ষক নিয়ে, আর কেউ অর্থায়ন করছে এমন কোনো পদ ছাড়াই। তবে এই পাঠ্যসূচি হুবহু আমদানি করলে এখানকার দুটি নির্দিষ্ট বিষয় বাদ পড়বে।

প্রথমটি ভাষা। এসব মডেল বাংলায় সবচেয়ে দুর্বল—বেশি বানিয়ে বলে, স্থানীয় তথ্যে পাতলা, আর “জানি না” বলতে বেশি অপারগ। বাংলা উত্তর যাচাই করতে গেলে শিক্ষার্থীর হাতে মেলানোর উপকরণও কম থাকে, কাজেই বানিয়ে বলার পাঠটি এখানে কম নয়, বেশি জরুরি।

দ্বিতীয়টি হলো, উত্তরটি কী কাজে লাগছে। যুক্তরাজ্যের শ্রেণিকক্ষে তোষামোদের সমস্যায় একটি দুর্বল রচনা তৈরি হয়। আর যে দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দ্বিতীয় ভাষায় চাকরির আবেদন, ভর্তির রচনা ও ফ্রিল্যান্স প্রস্তাব লিখতে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করেন, সেখানে সবাইকে “আপনার লেখা চমৎকার” বলা মডেল কার্যত তাঁদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পথে বসিয়ে দিচ্ছে—কারণটি না জানিয়েই।

এর ব্যবহারিক রূপটির জন্য নতুন পদ বা বাজেট লাইন লাগে না। লাগে একটিই পাঠ, বারবার: শিক্ষার্থীকে এমন প্রশ্ন দিন যার উত্তর সে আগে থেকেই জানে, মডেলকে উত্তর দিতে দিন, আর শিক্ষার্থীকে দিয়ে মডেলের খাতা দেখান। এই একটিমাত্র অনুশীলনেই একসঙ্গে শেখা হয় বানিয়ে বলা, তোষামোদ আর সাবলীলতার সীমা—আর যেকোনো শিক্ষক এটি একটি ফোন দিয়েই চালাতে পারেন।

এখানে আলোচনাটি কত দূর এগিয়েছে, তা নিয়ে দেখুন স্কুল প্রস্তুত নয় বলা প্রতিবেদনটি আর ১ হাজার ৬০০ প্রশিক্ষণ আসনের জন্য এক লাখ পরীক্ষার্থীর খবরটি।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি সম্পাদকীয় দল।