স্বাস্থ্য

প্রস্রাবের নমুনা শুঁকেই প্রোস্টেট ক্যানসার ধরতে পারে কুকুর—একই কাজ করবে এমন যন্ত্র বানানোর চেষ্টায় এল ১ লাখ পাউন্ডের অনুদান

কুকুরেরা ইতিমধ্যেই কাজটি করে। কঠিন অংশ হলো তাদের সামর্থ্যকে বড় মাত্রায় নিয়ে যাওয়া, আর তাতে দরকার হাতে লেখা পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য।

প্রস্রাবের নমুনা শুঁকেই প্রোস্টেট ক্যানসার ধরতে পারে কুকুর—একই কাজ করবে এমন যন্ত্র বানানোর চেষ্টায় এল ১ লাখ পাউন্ডের অনুদান

সুগন্ধি উদ্যোক্তা জো ম্যালোনের দেওয়া ১ লাখ পাউন্ডের অনুদান ক্যানসার শনাক্তকারী একটি ইলেকট্রনিক নাকের কাজ এগিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে অনুদানপ্রাপ্ত দাতব্য সংস্থাটি।

বাকিংহামশায়ারভিত্তিক মেডিকেল ডিটেকশন ডগস (এমডিডি) কোয়ান্টাম পদার্থবিদ ড. আন্দ্রেয়াস মেরশিনের সঙ্গে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যন্ত্রটি নিয়ে কাজ করছে, যা তৈরি হয়েছে কুকুরের গন্ধ শনাক্তকরণ সামর্থ্যের আদলে। সংস্থাটির পৃষ্ঠপোষক রানি ক্যামিলাকে একটি প্রদর্শনী দেখানোর পরই অনুদানটি আসে, যেখানে প্রোটোটাইপটি প্রস্রাবের নমুনা থেকে সফলভাবে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত করে।

টাকায় যা কেনা হচ্ছে

যন্ত্রটি নয়। অর্থায়নে বসানো হবে একটি স্নিফস্পেস—একটি সুরক্ষিত ঘর, যেখানে সংস্থার কুকুরেরা আরও নমুনা শুঁকতে পারবে আর ইলেকট্রনিক নাক তৈরিতে আরও ‘দৃঢ় তথ্য’ জোগাড় হবে।

এই অংশটিতে একটু থামা দরকার, কারণ আসল বাধাটি এখানেই। এখন কুকুরেরা সর্বোচ্চ আটটি স্ট্যান্ডে সাজানো নমুনা শোঁকে; প্রতিটি সারি শোঁকার পর প্রশিক্ষকদের হাতে তথ্য লিখে রাখতে হয় আর নমুনাগুলো অদলবদল করতে হয়। স্নিফস্পেস নমুনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরিয়ে দেবে, ফলে কম সময়ে বেশি নমুনা শোঁকা যাবে।

অর্থাৎ কৃত্রিম নাক বানানোর সীমাবদ্ধতা সেন্সর বা মডেলে নয়। সীমাবদ্ধতা হলো, ক্লিপবোর্ড হাতে মানুষ কত দ্রুত কুকুরগুলোকে চালাতে পারে—যারা প্রশিক্ষণের লেবেল তৈরি করে।

কুকুর কেন, আর নকল করা কেন কঠিন

এমডিডি বলছে, প্রতিটি রোগের একটি গন্ধ আছে, আর সংশ্লিষ্ট জৈবরাসায়নিক পরিবর্তন তাদের কুকুরেরা শুঁকে বুঝতে পারে। কুকুরের নাক অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রাসায়নিক শনাক্তকারী—এতে ঘ্রাণ-গ্রাহক প্রায় ৩০ কোটি, যেখানে মানুষের মোটামুটি ৫০ লাখ।

ব্যবধানটি ধরিয়ে দেওয়ার মতো একটি তুলনা দিয়েছে সংস্থাটি: এক কাপ চায়ে এক চা-চামচ চিনির গন্ধ মানুষ পেলে, কুকুর সেই একই চামচ চিনির গন্ধ পাবে অলিম্পিক আকারের দুটি সুইমিং পুলের সমান পানিতে।

৩০ কোটির বিপরীতে ৫০ লাখ
কুকুরের ঘ্রাণ-গ্রাহক প্রায় ৩০ কোটি; মানুষের মোটামুটি ৫০ লাখ। ইলেকট্রনিক নাক হলো এই অনুপাতের কুকুরের দিকটিকে বড় মাত্রায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। গ্রাফিক: টেক বিডি।

ইলেকট্রনিক সংস্করণটি রিয়েলনোজ ডট এআইয়ে তৈরি করেছেন মেরশিন, আর তা কাজ করে একই ভিত্তিতে। প্রোটিন ওডোরেন্ট রিসেপ্টর ব্যবহার করে প্রস্রাবের নমুনা থেকে গন্ধের অণু ধরা হয়, তারপর এআই দিয়ে খোঁজা হয় কোন কোন রিসেপ্টর সক্রিয় হচ্ছে তার চেনা ধরন। সেই এআই অংশটির প্রশিক্ষণে সহায়তা করছে এমডিডি।

কাজ কতদূর

প্রোটোটাইপটি এখন শুঁকছে মিল্টন কিনস হাসপাতালের রোগীদের দেওয়া ৫০০টি প্রস্রাবের নমুনা। এমডিডির প্রশিক্ষিত কুকুরেরা আগেই শনাক্ত করেছে এর কোনগুলোতে ক্যানসার আছে। তথ্যভান্ডারটি সম্পূর্ণ হলে গবেষকেরা যন্ত্রের ফলাফল কুকুরের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারবেন—ক্রমটি এভাবেই ঠিক: মাপকাঠি কুকুরেরা, বিপণন নয়।

প্রধান নির্বাহী ড. ক্লেয়ার গেস্ট অনুদানটিকে বলেছেন ‘খেলা বদলে দেওয়ার মতো’। ‘এই প্রযুক্তি আমাদের গন্ধের সেই স্বাক্ষরগুলো পড়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগ দিচ্ছে, আর ক্যানসার শনাক্তকরণে নির্ভরযোগ্য একটি ইলেকট্রনিক নাক তৈরির আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

মেরশিন বলেছেন, সংস্থাটির সুবিধা ও কর্মপদ্ধতি ‘সর্বাধুনিক’ এবং তা ‘সারা পৃথিবীতে অন্যদের অনুপ্রাণিত করছে’। অংশীদারিত্বের লক্ষ্যটিও তিনি বলেছেন: ‘রিয়েলনোজ ডট এআই ও এমডিডি একটি আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব গড়তে মন দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিশেষভাবে এনএইচএসের জন্য ইন ভিট্রো ডায়াগনস্টিক চিকিৎসা-যন্ত্র তৈরি করা—প্রোস্টেট ক্যানসারের স্ক্রিনিং ও আগেভাগে রোগনির্ণয়ের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তারা যাতে সেগুলো বিবেচনা করতে পারে; এরপর একই ঘ্রাণভিত্তিক পদ্ধতি অন্য ক্যানসারেও পরীক্ষা করা হবে।’

ম্যালোন বলেছেন, ‘আমার ঘ্রাণশক্তি সারা জীবনে আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। তাই গন্ধের সেই জগৎ কাজে লাগিয়ে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার পথ আমি সব সময়ই খুঁজতে চেয়েছি।’

এখন একদল কুকুরকে এই যন্ত্রে প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা হবে। স্নিফস্পেসে জোগাড় হওয়া তথ্য একদিন ই-নাককে অন্য রোগ শনাক্তেও সাহায্য করতে পারে। অন্য ইলেকট্রনিক নাক ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে খাদ্য ও পানীয়ের গুণমান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রতিরোধে।

বাকিংহামশায়ারের চেয়ে এখানে এটি কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ

প্রোস্টেট ক্যানসারের স্ক্রিনিং কেবল নির্ভুলতার নয়, খরচ ও নাগালের সমস্যাও। যে পরীক্ষায় দরকার প্রস্রাবের একটি নমুনা, একটি সেন্সর আর কোনো রেডিওলজিস্ট লাগে না—সেটি ঠিক এমন আকারের পরীক্ষা, যা জেলা হাসপাতালে চলতে পারে। নতুন রোগনির্ণয় প্রযুক্তির বেশির ভাগের ক্ষেত্রে এর উল্টোটাই ঘটে, যেখানে যন্ত্র আর বিশেষজ্ঞকে একসঙ্গে আসতে হয়।

তবে দুটি সতর্কতা। সময়রেখাটি দীর্ঘ: দশ বছরের বেশি কাজ, আর ঘোষিত লক্ষ্য এখনো এমন একটি যন্ত্র বানানো, যা এনএইচএস সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করে দেখবে। আর সেন্সরের ধরন পড়া এআইয়ের দুর্বলতা অন্য প্রতিটি রোগনির্ণয় মডেলের মতোই—পেছনের লেবেল করা তথ্য যতটা ভালো, সে ততটাই। সে কারণেই ছয় অঙ্কের অনুদান সংস্থাটি খরচ করছে এমন একটি ঘরে, যা কুকুরদের দ্রুত কাজ করতে দেয়।

এর যে সংস্করণ ইতিমধ্যেই এসে গেছে, তা আমরা দেখেছি: এনএইচএসের একটি ক্লিনিক এআই দিয়ে মেলানোমা বাতিল করে এক-তৃতীয়াংশ বেশি রোগী দেখছে। ধরনটি একই—প্রযুক্তি নিজের জায়গা অর্জন করে একটি বাধা সরিয়ে, শেষের বিচারটি নিজে করে ফেলে নয়।

সূত্র: বিবিসি

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।