বিশ্ব প্রযুক্তি

ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় এআই ডেটা সেন্টার থেকে সরে গেল মাইক্রোসফট — কারণটি এআই নয়, বিদ্যুতের গ্রিড

শিরোনাম বলছে এক প্রযুক্তিদানবের সরে যাওয়ার কথা। নিচের সংখ্যাটি বলছে, গ্রিড সংযোগ ডিসেম্বর থেকে সরে গেছে পরের দশকে—আর এটিই যেকোনো দেশের ডেটা সেন্টার পরিকল্পনার আসল বাধা।

ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় এআই ডেটা সেন্টার থেকে সরে গেল মাইক্রোসফট — কারণটি এআই নয়, বিদ্যুতের গ্রিড

ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় এআই ডেটা সেন্টার হওয়ার কথা ছিল যেটির—এসেক্সের লাফটনে এনস্কেলের ২০০ কোটি পাউন্ডের সেই প্রকল্প থেকে সরে গেছে মাইক্রোসফট। সেখানে একটি সুপারকম্পিউটারে অর্থায়নের কথা বলেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সরে যাওয়া নিয়ে তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

যে সংখ্যাটি সব ব্যাখ্যা করে

এ বছরের শেষেই প্রকল্পটির বিদ্যুৎ–সংযোগ পাওয়ার কথা ছিল। এনস্কেলকে এখন জানানো হয়েছে, তা মিলবে ২০৩০-এর দশকে। প্রতিষ্ঠানটি একে বলছে লন্ডনজুড়ে গ্রিডের সমস্যা—খবরটি প্রথম দেয় টেলিগ্রাফ, রোববার—আর বলছে এতে তাদের অন্য চুক্তিগুলোতে প্রভাব পড়বে না।

পুরো গল্পটি ওই এক বাক্যেই। ডেটা সেন্টার হলো যন্ত্রে ঠাসা একটি ভবন, যা পর্যাপ্ত বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করে না; আর সংযোগের তারিখ ডিসেম্বর থেকে পরের দশকে সরে যাওয়াকে বিলম্ব বলে না। ওটি ভিন্ন একটি প্রকল্প।

ডিসেম্বর, এরপর ২০৩০-এর দশক
এ বছরের শেষেই বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল লাফটনের। ২০০ কোটি পাউন্ড, ২৫০টি স্থায়ী চাকরি—আর সংযোগ এখন এক দশক দূরে। গ্রাফিক: টেক বিডি।

এনস্কেল এখন যা বলছে

এনস্কেল বলছে, লাফটন ও যুক্তরাজ্য—দুটির প্রতিই তারা অঙ্গীকারবদ্ধ, আর ‘এই প্রকল্পের জন্য বিকল্প বিদ্যুতের উৎস খোঁজা হচ্ছে, সঙ্গে যুক্তরাজ্যে সম্প্রসারণের অন্য জায়গাও’। মাইক্রোসফট প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট: ‘মাইক্রোসফটের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি।’ নরওয়ে, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রে দুই প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

গত মাসেই মাইক্রোসফট জানিয়েছিল, যুক্তরাজ্যে তাদের ৩ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের কিছু অংশ যাবে লাফটনের সুপারকম্পিউটারে। প্রকল্পটি চালু হলে ২৫০টি স্থায়ী চাকরি তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেষ সংখ্যাটি ধীরে পড়া দরকার। ২০০ কোটি পাউন্ড, ২৫০টি স্থায়ী চাকরি। ডেটা সেন্টার মূলধনের ব্যাপার, কর্মসংস্থানের নয়; যে দেশই এমন প্রকল্প বিবেচনা করে, তার উচিত একে চাকরির কর্মসূচি নয়, অবকাঠামো হিসেবেই হিসাব করা।

ঢাকায় এর গুরুত্ব কোথায়

ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে দুই বছর ধরে আলোচনা চলছে, আর আলোচনাটি সাধারণত জমি, করসুবিধা ও ব্যান্ডউইথ নিয়ে। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, আসল বাধা এর কোনোটিই নয়। বাধাটি হলো নির্দিষ্ট তারিখে, চুক্তিবদ্ধভাবে, ভবনটির প্রয়োজন অনুযায়ী মেগাওয়াটে গ্রিড–সংযোগ—আর পরিণত গ্রিড ও বিনিয়োগপ্রত্যাশী সরকার থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য নিজের সবচেয়ে বড় প্রকল্পে সময়মতো তা দিতে পারেনি।

তাই এ দেশের যেকোনো প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্নটি সরু ও অস্বস্তিকর: নিশ্চিত সংযোগের তারিখ কী, কত মেগাওয়াটে, আর তা পিছিয়ে গেলে চুক্তিতে কী হবে? ছাড়পত্র আছে কিন্তু বিদ্যুতের নির্দিষ্ট তারিখ নেই—এমন প্রকল্প আসলে একটি মাঠ। একই হিসাব দেখা গিয়েছিল স্কটল্যান্ডের প্রস্তাবিত ২৩টি হাইপারস্কেল প্রকল্পে, যেখানে চাহিদা গ্রিডের সক্ষমতাকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

মাইক্রোসফটের নীরবতায় দ্বিতীয় একটি শিক্ষাও আছে। প্রধান ভাড়াটে চলে গেছে, নির্মাতা রয়ে গেছে—স্বাভাবিক ক্রমটি এ-ই: যার হাতে সবচেয়ে সস্তা বিকল্প, সে-ই আগে সরে। আয়োজক দেশের ঝুঁকি হলো অর্ধনির্মিত এমন একটি সম্পদ হাতে থেকে যাওয়া, যার অর্থনীতি কেবল চলে যাওয়া ওই ভাড়াটেকে নিয়েই দাঁড়িয়েছিল।

এনস্কেলের বিবৃতির একটি শব্দবন্ধ অনুবাদ করা দরকার। ‘বিকল্প বিদ্যুতের উৎস খোঁজা’ বলতে সাধারণত বোঝায় প্রকল্পের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন—বাস্তবে গ্যাস টারবাইন—যা বসানো হয় কারণ গ্রিড সময়মতো দিতে পারছে না। এতে সময়সূচির সমস্যা মেটে, আর তৈরি হয় ভিন্ন একটি সমস্যা: প্রকল্পের ভেতরেই জ্বালানি পোড়ানো একটি স্থাপনা, নিজস্ব নিঃসরণসহ—এমন একটি দেশে, যার ডেটা সেন্টারের প্রস্তাব কিছুটা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের ওপর দাঁড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান এ পথেই গেছে, আর পরিবেশ নিয়ে তর্কটিও তাদের পিছু নিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে তৃতীয় একটি পাঠ: প্রকল্পের প্রস্তাবে ‘নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা’ লেখা থাকলে সেটিকে সুবিধা নয়, সতর্কসংকেত হিসেবে পড়া ভালো। এর অর্থ প্রায়ই এই যে, গ্রিডের ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না—আর সেই অনাস্থা বিনিয়োগকারীর হিসাবের ভেতরেই লেখা হয়ে গেছে। প্রশ্নটি তখন আর প্রকল্পটি হবে কি না তা নয়; প্রশ্নটি হলো বিদ্যুৎ কে দেবে, কত দামে, আর তার পরিবেশগত হিসাব কার খাতায় উঠবে।

সম্পর্কিত: বাটামের ডেটা সেন্টারে পানি নিয়ে বিক্ষোভ।

সূত্র: BBC

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।