কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় লেখা বইয়ের জন্য একটি সাহিত্য পুরস্কার চালু করেছেন ফ্রান্সের তিনজন উদ্যোক্তা। এর নাম ‘প্রি পাসকাল দ্য লিতেরাতুর আইএ’, নামকরণ হয়েছে ফরাসি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী ব্লেইজ পাসকালের নামে। পুরস্কারটির উদ্যোক্তা ফিলিপ রদ্রিগেজ, আলবিন সার্ভিয়ান্ত ও জিল মঁত্রে।
সময়টি আকস্মিক নয়। সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার গঁকুর কানাডীয়-হাইতীয় লেখক থেলিসোঁ ওরেলিয়েনের একটি বই দীর্ঘ তালিকা থেকে বাদ দেয়, কারণ অভিযোগ ওঠে যে পুরো উপন্যাসটিই এআই দিয়ে লেখা হয়েছে। নতুন পুরস্কারটি সেই অযোগ্যতার শর্তকেই নিয়েছে, আর বানিয়েছে অংশ নেওয়ার শর্ত।
নিয়মগুলো
অংশগ্রহণকারীদের জমা দিতে হবে এআই বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) সহায়তায় ফরাসি ভাষায় লেখা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, শব্দসংখ্যা ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার।
পাশাপাশি জানাতে হবে কোন এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে এবং কী ধরনের প্রম্পট বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আর আছে একটি বিষয়ের শর্ত, যা সবচেয়ে অস্বাভাবিক ধারা: পাণ্ডুলিপিতে এমন কোনো বিষয় থাকতে হবে, যা মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠা নৈতিক, সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে সহায়তা করতে পারে।
পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগে সেরা ১০টি পাণ্ডুলিপির তথ্য প্রকাশ করা হবে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে ছয় সদস্যের বিচারক প্যানেল। পুরস্কার পাওয়া পাণ্ডুলিপিটি বিনা মূল্যে বই আকারে প্রকাশ করা হবে।

প্রকাশের শর্তটিই কেন কৌতূহলের
প্রম্পট জানানোর শর্তটি পুরস্কারের অর্থের চেয়ে বেশি কাজ করে। লেখালেখিতে এআই নিয়ে প্রতিটি তর্ক একই জায়গায় আটকে যায়: সহায়তা কোথায় শেষ আর লেখকত্ব কোথায় শুরু, তা নিয়ে কেউ একমত হতে পারে না; আর অন্যের প্রক্রিয়ার ভেতরে কেউ দেখতেও পারে না। শনাক্তকরণের সরঞ্জাম নির্ভরযোগ্য নয়, অস্বীকার খণ্ডনযোগ্য নয়—ফলে পুরো বিতর্কটি চলে সন্দেহের ওপর।
মডেল ও প্রম্পট চাওয়া সেটিকে একটি দলিলে পরিণত করে। ভালো এআই-সহায়ক লেখা কী, তা এতে মিটবে না; তবে এতে একশ্রেণির কাজ তুলনাযোগ্য হয়ে ওঠে: দশটি পাণ্ডুলিপি, প্রতিটির সঙ্গে তার পদ্ধতি জোড়া, আর বিচার করছেন এমন মানুষেরা যাঁরা দেখতে পাচ্ছেন যন্ত্রের কাছে কী চাওয়া হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, এটি এমন একটি গবেষণা-তথ্যভান্ডারও, যা এখন কোথাও নেই।
যে সমস্যাটি এতে মেটে না
ঘোষণা শেষ পর্যন্ত ঘোষণাই। মডেল কতটা লিখেছে তা কম করে জানানো থেকে কেউ অংশগ্রহণকারীকে আটকাচ্ছে না, আর পাণ্ডুলিপি ও প্রম্পট পাশাপাশি পড়া ছাড়া আয়োজকদের নিরীক্ষার কোনো উপায়ও নেই। পুরস্কারটি দাঁড়িয়ে আছে সদিচ্ছার ওপর—আর গঁকুর-বিতর্ক ঠিক সেটিরই ঘাটতি দেখিয়েছিল।
আর বিষয়ের শর্তটি বাকি সবকিছুর সঙ্গে বেমানানভাবে বসে আছে। স্পষ্ট মানদণ্ড দরকার যে পুরস্কারের, সেটি এমন প্রশস্ত একটি বিষয় জুড়ে দিয়েছে যেখানে প্রায় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বই এঁটে যায়—প্রথম বছরেই ছয় বিচারকের হাতে এটি তুলে দিচ্ছে বিপুল স্বাধীনতা, আর এই বছরেই সবাই ফলটিকে পড়বে গোটা শ্রেণিটির ওপর রায় হিসেবে।
পুরস্কারের অর্থমূল্য নিয়েও আয়োজকেরা কিছু জানাননি—বিজয়ী পাণ্ডুলিপি বিনা মূল্যে বই আকারে প্রকাশ করা হবে, এটিই ঘোষিত প্রাপ্তি। অর্থাৎ এখানে মূল আকর্ষণ টাকা নয়, প্রকাশনা আর স্বীকৃতি। এআই-সহায়ক লেখা নিয়ে যে লেখকেরা এখন প্রচলিত পুরস্কারে আবেদনই করতে পারেন না, তাঁদের জন্য সেটিই যথেষ্ট প্রণোদনা হতে পারে।
এটি বাংলা লেখালেখিতেও পৌঁছায় কেন
ফরাসি প্রকাশনায় যে বিতর্ক এসেছে, তা বাংলা প্রকাশনাতেও আসবে—আর কারিগরি দিকটি ভালোর বদলে খারাপই হবে। এআই মডেল ফরাসির চেয়ে বাংলা অনেক কম সাবলীলভাবে লেখে, অর্থাৎ সহায়তা ধরা পড়া সহজ—আর এর মানেও এই যে, যিনি এটি ভালোভাবে ব্যবহার করছেন, যন্ত্র থেকে ব্যবহারযোগ্য গদ্য বের করতে তিনি কম নয়, বেশি পরিশ্রম করেছেন।
ফলে এখানে কোনো বিচারক প্যানেল বা প্রকাশককে প্রকাশ্যে মীমাংসা করতে হওয়ার আগেই যে প্রশ্নটির নিষ্পত্তি দরকার, এই পুরস্কার সেটির উত্তর দিয়েছে কোনো ইশতেহারে নয়, নিজের আবেদনপত্রে: প্রশ্নটি যন্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না, তা নয়; প্রশ্নটি লেখক কীভাবে করেছেন তা বলবেন কি না।
আরও পড়ুন: এর আগে গঁকুরের দীর্ঘ তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা।




