ইউক্রেন রুশ ডেটা সেন্টারে হামলার পর একটি দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে: রুশ বট নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইন্টারনেট শান্ত হয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সোমবার ইঙ্গিত দেন, ‘বট কম’ থাকায় অনলাইনে ‘কম ঘৃণা, কম বিভাজন আর কম উসকানি’ দেখা যাচ্ছে।
বিবিসি ভেরিফাই এই অভিযানগুলো যাঁরা পর্যবেক্ষণ করেন তাঁদের জিজ্ঞেস করেছে। তাঁরা বলছেন, হামলাগুলো এগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে এমন প্রমাণ নেই।
গ্রাফটি আসলে যা দেখাচ্ছিল
দাবিটি ছড়িয়েছে ক্লাউডফ্লেয়ারের তথ্য দিয়ে বানানো গ্রাফের ওপর ভর করে, যেখানে ইয়ানডেক্সের নেটওয়ার্কে বট কার্যকলাপ কমতে দেখা যায়। অনুমান করা হয়, ক্রেমলিনঘনিষ্ঠ অপতথ্যের অ্যাকাউন্টগুলো অফলাইনে চলে গেছে।
ক্লাউডফ্লেয়ার স্পষ্ট করেছে, তাদের হিসাব গোনে সব স্বয়ংক্রিয় ইন্টারনেট অনুরোধ—যার মধ্যে আছে সার্চে দেখানোর জন্য ওয়েবপাতা ঘেঁটে বেড়ানো বটও। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই পতন ‘অগত্যা সামাজিক মাধ্যমের বটের আচরণ নয়’।
অর্থাৎ মাপজোখটিতে ওয়েবের সাধারণ যন্ত্রপাতিও ঢুকে আছে। কোনো ডেটা সেন্টারের সঙ্গে সার্চ ইঞ্জিনের ক্রলার বন্ধ হলে গ্রাফ নামে, অথচ একটি অপতথ্যের অ্যাকাউন্টেরও কিছু হয়নি।
কতদূর ছড়াল
চেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য তোমাশ জদেহোভস্কি এক্সে একটি পোস্ট শেয়ার করেন: ‘নিশ্চিত হলে এটি তাৎপর্যপূর্ণ: রুশ ডেটা সেন্টারে আঘাত লাগল, আর এএফডি ঘিরে অনলাইন তৎপরতা হঠাৎ ধসে পড়ল।’ পোস্টটি দেখা হয়েছে চল্লিশ লাখের বেশি বার।
তিনি পরে বলেছেন, তিনি ‘এটি স্পষ্ট তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেননি’। পোস্টটি এখনো তাঁর প্রোফাইলের শীর্ষে পিন করা।
মস্কোঘনিষ্ঠ প্রভাব-অভিযান পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সংগঠন ডিটিম-এর গবেষকেরা বিবিসি ভেরিফাইকে বলেছেন, পরিচিত রুশ অ্যাকাউন্টগুলোর ট্রাফিকে কোনো বদল তাঁরা দেখেননি।
হামলাগুলো সত্যি
এর কোনোটিই হামলাগুলোকে অস্বীকার করে না। ইউক্রেনীয় ইন্টারনেট হাবে রুশ হামলার জবাবে ৮ অক্টোবর থেকে ইয়ানডেক্সের পাঁচটি ডেটা সেন্টারের তিনটিতে আঘাত করেছে ইউক্রেন, আর দ্বিতীয় হামলার পর ইয়ানডেক্স বলেছিল তারা সেবা সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
যা প্রমাণহীন, তা এগুলো থেকে টানা সিদ্ধান্তটি।
বাংলাদেশে এর মানে কী
এটি এমন এক ব্যর্থতার নমুনা, যা নির্বাচনের মৌসুমে এখানেও আসবে—আর বিষয়বস্তুর চেয়ে এর আকৃতিটি বেশি কাজের।
দাবিটি আকর্ষণীয় ছিল কারণ এটি তৃপ্তিদায়ক, এর সঙ্গে ছিল সত্যিকারের প্রতিষ্ঠানের সত্যিকারের গ্রাফ, আর এটি শ্রোতারা যা আশা করছিলেন তা-ই নিশ্চিত করছিল। কিছুই বানানো হয়নি। ভুলটি পুরোপুরি ছিল গ্রাফটি কী মাপছিল তাতে—এটি সংজ্ঞার সমস্যা, তথ্যের নয়; আর সংজ্ঞার সমস্যা এক নজরে ভুল দেখায় না।
এ থেকে বয়ে নেওয়ার প্রশ্নটি বিবিসি ভেরিফাই কার্যত যা করেছে তা-ই: কী গোনা হচ্ছে? ‘বট’ লেখা গ্রাফ সার্চ ক্রলার গুনতে পারে। ‘ভুয়া অ্যাকাউন্ট’ লেখা গ্রাফ সব ধরনের স্থগিত অ্যাকাউন্ট গুনতে পারে। ‘সরানো অপতথ্যের’ সংখ্যা একই পোস্টের নকল গুনতে পারে।
এর একটি বাংলাদেশি সমান্তরাল এই সংগ্রহেই আছে: ৫ হাজার আসনের জন্য ১৮ লাখ নিবন্ধন দেখলে মনে হয় বিপুল চাহিদা—যতক্ষণ না প্রশ্ন করেন নিবন্ধন জিনিসটা কী, আর তখন সেটি যাচাইয়ের ব্যর্থতা। একই সংখ্যা, দুটি উল্টো গল্প, আর কোনটি পাবেন তা ঠিক করে দেয় লেবেলটি।
গ্রাফ পড়ার তিনটি প্রশ্ন
এই ধরনের ভুল ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না; তিনটি প্রশ্ন করলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়।
এক, গ্রাফটি কে বানিয়েছে আর মূল তথ্য কে দিয়েছে? এখানে তথ্য দিয়েছে ক্লাউডফ্লেয়ার, কিন্তু গ্রাফ আর শিরোনামটি বানিয়েছেন অন্যরা। প্রতিষ্ঠানটি নিজে ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, বরং পরে তা সংশোধন করেছে।
দুই, অক্ষের লেবেলে ঠিক কী লেখা? ‘বট ট্রাফিক’ আর ‘সামাজিক মাধ্যমের ভুয়া অ্যাকাউন্ট’ এক জিনিস নয়, অথচ একই গ্রাফ দুটোকেই বোঝাতে ব্যবহার করা যায়।
তিন, একই সময়ে আর কী ঘটেছে? ডেটা সেন্টারে হামলা হলে ওই নেটওয়ার্কের সব কিছুই কমে—সার্চ ক্রলার, বিজ্ঞাপনের অনুরোধ, সাধারণ ওয়েবসাইটের ট্রাফিক। পতনটি সত্যি; ব্যাখ্যাটি বাছাই করা।
বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় এই তিনটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে ‘অমুক পেজের ফলোয়ার হঠাৎ বেড়েছে’ বা ‘এত হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট সরানো হয়েছে’ ধরনের দাবিতে—যেখানে সংখ্যাটি সাধারণত সত্যি, আর অর্থটি নয়।
সূত্র: বিবিসি ভেরিফাই।




