সপ্তাহের পর সপ্তাহ সরকারি সুদের খরচ লাফিয়ে বাড়ার পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোকে ঋণ নেওয়া কমাতে ও ঋণের মাত্রা নামাতে হবে—সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান।
তিনি যা বলেছেন
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো ঋণের মাত্রা ঠেলে তুলেছে "স্বর্গে না যাওয়া এক সিঁড়ির মতো", অথচ সরকারগুলো "ওই সেবা-খরচ সামলাতে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি"। তিনি বলেন, "এখনই সেই ব্যবস্থা নেওয়ার সময়"; আর যোগ করেন, রাজনীতিকদের "সাহস" দরকার।
এই বক্তব্য এল এমন সময়ে, যখন যুদ্ধে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সরকারি ঋণের খরচ লাফিয়ে বেড়েছে, আর তা মূল্যস্ফীতিতে ইন্ধন দিয়েছে। আগস্টে যুক্তরাজ্যের ঋণ—কর আদায় ও ব্যয়ের ফারাক—ছিল ১ হাজার ৮৩০ কোটি পাউন্ড (২ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার), যা এক বছর আগের চেয়ে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি এবং সরকারি পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। ইনভেস্টমেন্ট উইক জানিয়েছে, এটি অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির প্রক্ষেপণের চেয়ে ৩৫০ কোটি পাউন্ড বেশি; একই সপ্তাহে হিসাবগুলো জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। গার্ডিয়ান আরও জানায়, কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ঋণ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
বাংলাদেশে এর মানে কী
ধনী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে দেওয়া আইএমএফের সতর্কবার্তা ধনী দেশগুলোর গল্প নয়। উন্নত অর্থনীতিতে ঋণের খরচ বাড়লে টাকার দাম বাড়ে সবার জন্য, আর সবচেয়ে বেশি বাড়ে যাদের হাতে সবচেয়ে কম জায়গা তাদের জন্য।
কৌশলটি সরল। মার্কিন বা ব্রিটিশ সরকারি ঋণে যাঁরা উঁচু ও নিরাপদ মুনাফা পেতে পারেন, তাঁরা এর চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ধরে রাখতে চান বড় বাড়তি সুবিধা। উদীয়মান বাজারের বন্ডের দাম নতুন করে ঠিক হয়, ডলারের বিপরীতে মুদ্রা দুর্বল হয়, আর ঋণগ্রহীতার নিজের আচরণে কোনো বদল ছাড়াই চালু বৈদেশিক ঋণ নবায়নের খরচ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় তিন জায়গায়। বৈদেশিক ঋণের সেবা ব্যয় বাড়ে, আর বাজেটে এটি এমনিতেই সবচেয়ে দ্রুত বাড়া খাত। টাকা চাপে পড়ে, কারণ ডলার শক্তিশালী হলে প্রতিটি আমদানি—জ্বালানি, খাদ্যশস্য, মূলধনি যন্ত্র, শিল্পের কাঁচামাল—দেশি মুদ্রায় বেশি দামি হয়ে যায়। আর নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন দামি হয়, যা সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায় রেয়াতি নয় বরং বাণিজ্যিক শর্তে নেওয়া অবকাঠামোর তালিকায়।
সত্যিকারের অনুকূল দিকটি রেমিট্যান্স, যা ডলার শক্তিশালী থাকলে সাধারণত ভালো থাকে—কারণ পাঠানো প্রতিটি ডলারে বেশি টাকা মেলে। এটি বাস্তব একটি ঢাল, আর এ কারণেই আগের ডলার-চক্রগুলো বাংলাদেশ তুলনীয় কয়েকটি অর্থনীতির চেয়ে ভালোভাবে সামলেছে। আবার পুরোপুরি উপসাগরীয় অঞ্চল ও মালয়েশিয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ছবিটির এ অংশই সবচেয়ে কম নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
জর্জিয়েভার আসল যুক্তিটি শিরোনাম থেকে আলাদা করে দেখা দরকার। তিনি ঋণের আকার নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি সতর্ক করছেন তা শোধের খরচ নিয়ে—কথাটি হলো, একটি সরকার বছরের পর বছর একই ঋণ নিয়ে চলতে পারে, আর তারপর দেখতে পারে বাড়তি এক টাকাও না ধার করে সুদের বিল দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের পড়া উচিত নিজেকে উদ্দেশ করে বলা কথা হিসেবে, কানে আসা কথা হিসেবে নয়। রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রাখবে কি না—তরুণ প্রজন্মের যে সংশয় নিয়ে আমরা লিখেছি জেন-জি ও রাষ্ট্রীয় পেনশন লেখায়—তার শুরুও ঠিক এই হিসাব থেকেই।




