কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তথ্যকেন্দ্র, চিপ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে মাইক্রোসফট। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬০ হাজার কর্মী কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ভারতের নির্দিষ্ট পদে কর্মরতদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিতে শুরু করেছে।
শর্ত
জুনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে মাইক্রোসফটের পূর্ণকালীন কর্মী প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী এই কর্মসূচির আওতায় পড়তে পারেন।
প্রস্তাব যাচ্ছে ৭০তম বা তার নিচের স্তরের কর্মীদের কাছে। রাজি হলে তাঁরা তিন মাসের অগ্রিম বেতনের পাশাপাশি চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী প্রতিবছরের জন্য এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাইক্রোসফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা অ্যামি কোলম্যান সোমবার কর্মীদের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার এই প্রস্তাব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; এর মাধ্যমে কর্মীদের আরও নমনীয়তা দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভব হলে তাঁদের কর্মজীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিজেদের বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিনিয়োগ বাড়িয়েও কর্মী কমানো কেন
মাইক্রোসফটের বিপুল এআই ব্যয়ের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় আদৌ আসবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। তাই এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যয় কমানো ও কর্মী কাঠামো পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
যা সত্যিই অস্পষ্ট—আর প্রথম আলো সেটি স্পষ্ট করেই বলেছে, যা সৎ অবস্থান—তা হলো, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে বলে মাইক্রোসফট কর্মী কমাচ্ছে, নাকি নিজের এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের ব্যয় সামাল দিতে এই উদ্যোগ।
দুটি ব্যাখ্যা দুই বিপরীত দিকে যায়। প্রথমটি বলে, কাজটি এখনো করতে হবে, তবে কম লোকেই এখন সেটি করা যায়। দ্বিতীয়টি বলে, কাজটিতে একই সংখ্যক লোকই লাগবে, কিন্তু টাকাটা ভবন আর চিপে প্রতিশ্রুত হয়ে গেছে। কেবল প্রথমটিই শ্রমের জায়গায় এআই বসে যাওয়ার গল্প; দ্বিতীয়টি মূলধন বিন্যাসের গল্প, যার হিসাবটা কাকতালীয়ভাবে চাকরিতে মাপা হচ্ছে।
কোনটি, তা মাইক্রোসফট বলেনি; আর তাদের অন্য সিদ্ধান্তের ধরনও বিষয়টি নিষ্পত্তি করে না। এ মাসেই তারা ব্রিটেনের বৃহত্তম এআই ডেটা সেন্টার থেকে সরে এসেছে—হাজার হাজার কোটি ডলারের মাপে যে প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেয় আর পিছিয়ে আসে, সে কোনো একটি সরল পরিকল্পনা মেনে চলছে না।
এটি দ্বিতীয় দফা, আর প্রথমটি কাজ করেছিল
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল মাইক্রোসফট। প্রস্তাব পাওয়াদের ৩০ শতাংশের বেশি সুযোগটি নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সেই কর্মসূচি থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নতুন প্রস্তাবটি সাজানো হয়েছে।
ওই গ্রহণের হারটিই ধরে রাখার মতো সংখ্যা। ৬০ হাজারের মধ্যে আবার ৩০ শতাংশ রাজি হলে একটিও ছাঁটাইয়ের নোটিশ ছাড়াই চলে যাবেন প্রায় ১৮ হাজার মানুষ—সত্যিকারের বড় মাপের পুনর্গঠন, অথচ বাধ্যতামূলক ছাঁটাইয়ের সঙ্গে আসা আইনি প্রক্রিয়া, পরামর্শের বাধ্যবাধকতা বা শিরোনাম কিছুই ছাড়াই।
গত জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা জানিয়েছিল, যা তাদের বৈশ্বিক কর্মীসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে এক্সবক্সের গেমিং ব্যবসা পুনর্গঠন ও পাঁচটি গেম স্টুডিও বিক্রির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল তারা।
এখান থেকে নেওয়ার মতো
বাংলাদেশে এই খাতে যাঁরা কাজ করেন বা লোক নেন, তাঁদের জন্য দুটি বিষয়।
প্রথম, স্বেচ্ছা অবসরের প্রস্তাব নিরপেক্ষ উপহার নয়। বাইরে যাঁদের সুযোগ সবচেয়ে ভালো, তাঁদের কাছেই এটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়—অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান যাঁদের সবচেয়ে কম হারাতে চায়, তাঁদেরই এটি নেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যারা বারবার এ ধরনের কর্মসূচি চালায়, তারা সাধারণত এটি আবিষ্কার করে।
দ্বিতীয়, মূলধন বনাম শ্রমের প্রশ্নটি কেবল মাইক্রোসফটের নয়। প্রতিটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন এআই অবকাঠামোয় যে অঙ্ক প্রতিশ্রুত করছে, হিসাবের খাতায় তা কোথাও থেকে জোগাড় করতেই হবে—আর অ্যানথ্রপিকের তালিকাভুক্তির নথি গতকালই সেই ব্যয়ের মাত্রা নথিবদ্ধ করেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন বলে এআই তাকে আরও দক্ষ করেছে, তখন ন্যায্য পরবর্তী প্রশ্নটি হলো—দক্ষতাটা কাজে, নাকি বেতনের খাতায়।
প্রসঙ্গত, এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বের অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও একই মাপে অর্থ ব্যয় করছে।




