নাক ডাকা সঙ্গীর পাশে ঘুমিয়ে সকালে কি কখনো চাপে, মনোযোগহীন বা ভুলোমনা লেগেছে? নাক ডাকা এতটাই সাধারণ যে একে সাধারণত নিরীহ বিরক্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাক ডাকা মানুষের পাশে ঘুমানো আপনার স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
নাক ডাকা জিনিসটা কী
ঘুমের সময় শ্বাসনালির ওপরের অংশের নরম কলার কম্পন থেকেই নাক ডাকা হয়—ব্যাখ্যা করেছেন ডেন্টাল স্লিপ মেডিসিনে বিশেষ আগ্রহী দন্তচিকিৎসক ড. ক্লেয়ার সাইমন। পেশি শিথিল হলে শ্বাসনালি সরু হয়ে আসে, আর তার মধ্য দিয়ে বাতাস গেলে আশপাশের কলা কাঁপে।
ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাক ডাকেন, নারীদের চেয়ে পুরুষদের বেশি। আর স্লিপ ফাউন্ডেশনের একটি মার্কিন জরিপ বলছে, নাক ডাকা সঙ্গী আছে এমন ৭৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তাঁদের ঘুমে প্রভাব পড়েছে।
যেখানে ব্যবস্থা নিতে হয়
এখানে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পরিস্থিতি আছে, আর দুটিকে গুলিয়ে ফেলার কারণেই মানুষ বছরের পর বছর সহ্য করে যায়।
সাধারণ নাক ডাকা শব্দের সমস্যা: বিরক্তিকর, পাশের মানুষের ঘুম নষ্ট করে, তবে নাক ডাকা মানুষটির জন্য নিজে থেকে বিপজ্জনক নয়। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া একটি রোগ, আর এর লক্ষণ নির্দিষ্ট—জোরে নাক ডাকার মাঝে নীরবতা, যখন শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়; হাঁপিয়ে ওঠা বা দমবন্ধ হওয়ার শব্দ; আর দিনের বেলা এতটাই ঘুম পাওয়া যে টেলিভিশন দেখতে দেখতে—কিংবা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালাতে চালাতে—ঘুমিয়ে পড়া।
চিকিৎসা না হওয়া অ্যাপনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের। আবার এটি বেশ ভালোভাবেই চিকিৎসাযোগ্য। বিষয়টি খেয়াল করার সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকেন যিনি, তিনি প্রায় কখনোই রোগী নন—তিনি পাশে শোয়া মানুষটি; এ কারণেই এটি সহ্য করার বদলে তোলা দরকার।
বাংলাদেশে এর মানে কী
এখানে স্লিপ মেডিসিন বিশেষত্ব হিসেবে প্রায় নেই বললেই চলে। হাতে গোনা কয়েকটি স্লিপ ল্যাব আছে, প্রায় সবই ঢাকায় ও বেসরকারি; আর স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকা বাংলাদেশিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের রোগটি কখনো শনাক্তই হবে না।
এটি শোনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে ঝুঁকির ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে। অ্যাপনিয়া চলে ওজন ও ঘাড়ের বেড়ের সঙ্গে, আর শহুরে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস—দুটোই দ্রুত বেড়েছে; আর ডায়াবেটিস ও অ্যাপনিয়া দুই দিকেই চলে, একটি আরেকটিকে খারাপ করে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিস-ভারের দেশগুলোর একটির নিচে তাই সমান বড় একটি অশনাক্ত অ্যাপনিয়ার ভারও আছে।
তিনটি কথা জানা দরকার। বাড়ির কেউ জোরে নাক ডাকলে এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে, সেটি সকালের নাশতার টেবিলে বলার মতো মজা নয়—সেটি উপসর্গ, আর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কারণ। দামি কিছুর আগে সবচেয়ে ভালো প্রমাণসমর্থিত ব্যবস্থাগুলো সাদামাটা: প্রযোজ্য হলে ওজন কমানো, চিত হয়ে নয় কাত হয়ে শোয়া, ঘুমের আগে মদ ও ঘুমের ওষুধ এড়ানো, আর নাক বন্ধ থাকলে তার চিকিৎসা।
আর সঙ্গীর জন্য: আপনার ভেঙে যাওয়া ঘুম সত্যিকারের স্বাস্থ্যক্ষতি, লজ্জা পাওয়ার মতো অভিযোগ নয়। মূল সমস্যার পরীক্ষা চলাকালে অন্য ঘরে ঘুমানো যুক্তিসংগত, সাময়িক ও চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত—আর যেসব পরিবারে তা সম্ভব নয়, অর্থাৎ বেশির ভাগ পরিবারেই, সেখানে নাক ডাকা মানুষটির পরীক্ষা করানো কম নয়, বরং আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।




