ব্রাউনফিশের ভিডিওতে দেখা যায় ভাঙা চেয়ার-টেবিল, চূর্ণ টেলিভিশন, মেঝেজুড়ে ছড়ানো যন্ত্রপাতি আর কান্নারত কর্মীরা। এমন একটি রাত আসলে কী ধ্বংস করে, তা নির্দিষ্ট করে বলা দরকার—কারণ ফ্রেমের সবচেয়ে সস্তা জিনিসটির নাম আসবাব।
যে হিসাব কেউ খুলে লেখে না
ঢাকার একটি কর্মক্ষম প্রোডাকশন স্টুডিওর ছোট পরিসরে অবাক করার মতো মূল্য জমে থাকে। একটি মিররলেস বডি আর দুই-তিনটি লেন্স। লাইট, স্ট্যান্ড ও মডিফায়ার। অডিও—ল্যাভেলিয়ার, বুম, রেকর্ডার। এডিট করার মতো দ্রুতগতির একটি মেশিন আর তার সামনের মনিটর। স্ট্যান্ড, গিম্বল, ব্যাটারি, কার্ড, ক্যাব্ল। কোনোটিই দুর্লভ নয়, কিন্তু সব মিলিয়ে অঙ্কটা কয়েক লাখ টাকা—যার বেশির ভাগ আমদানি করা, আর বেশির ভাগই একসঙ্গে নয়, বছরের পর বছর ধরে কেনা।
এরপর আছে সেই অংশ, যার দাম নেই—কারণ তা আর কেনা যায় না: ফুটেজ। র শট, অসমাপ্ত এডিট, প্রজেক্ট ফাইল, আর এমন শুটের আর্কাইভ যা আবার করা সম্ভব নয়। এসব যদি ঘরের মেশিনে আর পাশের ড্রাইভে থেকে থাকে, তবে সেগুলোর সঙ্গেই তা গেছে।
আর আছে এমন একটি অংশ, যা কেউ হিসাবেই ধরে না: প্রতিশ্রুতিতে ভরা একটি প্রোডাকশন সূচি। ডেলিভারির তারিখ বেঁধে দেওয়া কোনো ব্র্যান্ড চুক্তি স্টুডিও থেমে গেছে বলে থামে না।
এ দেশের ক্রিয়েটররা কেন পুরো ঝুঁকিটাই নিজে বহন করেন
বেশির ভাগ শিল্পে এ জন্যই বিমা থাকে। বাংলাদেশের ক্রিয়েটর অর্থনীতিতে কার্যত তা নেই। এ দেশের সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো পলিসি লেখে কারখানা, দোকান, যানবাহন ও পণ্যের জন্য—প্রোডাকশন স্টুডিওর সরঞ্জামের জন্য নয়, আর কোনো চ্যানেলের ব্যবসা বন্ধ থাকার ক্ষতির জন্য তো নয়ই। কভার চাইতে গিয়ে ক্রিয়েটর সাধারণত দেখেন হয় কোনো পণ্যই নেই, নয়তো প্রিমিয়াম এমনভাবে ধরা যেন ঝুঁকিটা অজানা—আর বিমাকারীর দিক থেকে সেটি সত্যিই অজানা, কারণ ক্ষতির কোনো তথ্যই কারও কাছে নেই।
দ্বিতীয় ফাঁকটি ভাড়ার বন্দোবস্তে। অনেক স্টুডিওই চলে অন্যের জমিতে ভাড়া নেওয়া কাঠামোয়, অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায়—এ ঘটনার কেন্দ্রেও ঠিক সেই পরিস্থিতি, যেখানে পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী বিরোধটি সেই সম্পত্তি নিয়ে, যার ওপর স্টুডিওটি দাঁড়িয়ে ছিল। নিবন্ধিত চুক্তি না থাকলে পরে দাবি করার জোর খুব কম থাকে।
এ সপ্তাহেই করার মতো কাজ
- ফুটেজ প্রাঙ্গণের বাইরে নিন। স্টুডিওর ভেতরের একটি ড্রাইভ ব্যাকআপ নয়। শেষ হওয়া কাজের জন্য ক্লাউড, আর দ্বিতীয় একটি ফিজিক্যাল ড্রাইভ যা থাকবে সম্পূর্ণ অন্য কোথাও—বাড়িতে, অন্য কোনো অফিসে। তালিকার একমাত্র স্থায়ী ক্ষতি এটিই।
- যন্ত্রপাতির ছবি ও তালিকা রাখুন সিরিয়াল নম্বর ও কেনার রসিদসহ, আর সেই তালিকাও রাখুন বাইরে। এটি না থাকলে দাবি করা যায় না, নির্দিষ্ট করে অভিযোগ করা যায় না, আর ঘরে কী ছিল তা-ও প্রমাণ করা যায় না।
- ভাড়ার চুক্তি লিখিত করুন ও নিবন্ধন করান। নিচের জমির মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে অনিবন্ধিত বন্দোবস্তের মূল্য খুবই কম।
- তবু বিমা প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞেস করুন। ক্রিয়েটরদের জন্য আলাদা পণ্য না থাকলেও কিছু সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠান সরঞ্জামের তালিকা ধরে অল-রিস্ক পলিসি লিখতে রাজি হয়। ক্রিয়েটররা যত দিন না যথেষ্টসংখ্যায় চাইছেন, বাজারটি তৈরি হবে না।
- ব্যবসাকে ব্যক্তির থেকে আলাদা করুন। স্টুডিও নিবন্ধন করা, তার হিসাব রাখা আর প্রতিষ্ঠানের নামে চুক্তি করাই ওপরের সবকিছুকে কার্যকর করে তোলে।
বড় কথাটি
বাংলাদেশের ক্রিয়েটর অর্থনীতি আর কৌতূহলের বিষয় নয়। এখানে কাজ করেন সম্পাদক, ক্যামেরাম্যান, লেখক, প্রোডাকশন সহকারী ও ব্যবস্থাপক; আয় আসে বৈদেশিক মুদ্রায়। কিন্তু এই আকারের অন্য যেকোনো ব্যবসাকে যেসব কাঠামো রক্ষা করে, তার বাইরেই এটি বড় হয়েছে—আদর্শ চুক্তি নেই, খাতভিত্তিক বিমা নেই, নিবন্ধন নেই, আর কিছু ঘটে গেলে প্রতিকারও প্রায় নেই। এর একটি রূপ আমরা দেখেছি ফুডপান্ডার বিরোধের পেছনের সরবরাহ-কাগজপত্রে, আরেকটি দেখেছি যখন এনগেজমেন্ট নিয়ে প্ল্যাটফর্ম ক্রিয়েটরদের বিরুদ্ধে মামলা করে: কাজটি যাঁরা করেন, পরিণত কোনো শিল্পে যে ঝুঁকি অন্য কারও কাঁধে থাকত, সেটি তাঁরাই বইছেন।




